লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক সাধক মুস্তাফা জামান আব্বাসী

লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক সাধক মুস্তাফা জামান আব্বাসী

0

মোস্তফা কামাল মজুমদার
সবাইকে আপন করে নিয়ে কথা বলার যে অল্প ক’জন মানুষ বাংলাদেশে এখনো আছেন, তাদের মধ্যে মুস্তাফা জামান আব্বাসী অন্যতম। লোকসঙ্গীতের কিংবদন্তি সম্রাট আব্বাস উদ্দিন আহমেদের তৃতীয় সন্তান মোস্তফা জামান আব্বাসী তাঁর পিতার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন অনেক যত্নকরে। বাংলাদেশের মানুষের মনের কথা যে ক’জনার কন্ঠে ধবনিত এবং কলমে লিখা হয়েছে তাদের পুরোধা ছিলেন আব্বাস উদ্দিন। মোস্তফা জামান আব্বাসী একই মৌলিক সাধনায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন সারাটা জীবন। তার সাথে তিনি যোগ করেছেন কিছু নতুন মাত্রা।১৯৪৮ সালের কথা। ঢাকায় এক বিশাল জনসমাবেশ লোকে লোকারন্য। যারা শারিরিকভাবে দুর্বল তারা মানুষের চাপে পদদলিত হবার উপক্রম। হঠাৎ সব সোরগোল থেমে গেল। আব্বাস উদ্দিন আহমেদের কন্ঠে ভেসে আসা লোকসঙ্গীতের মধুর সূরে সবাই  মাতোয়ারা। কি অসম্ভব শক্তি আর তান ছিল তাঁর গানে? পিন পতন নিরবতায় লক্ষ জনতা তার গান শুনল। আর অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ফিরে পেল বিশাল জনসমুদ্রের শৃংখলা। কথাগুলো সরাসরি শোনা চাঁদপূরস্থ কচুয়া থানাধীন গুলবাহার গ্রামের আজিজুর রহমান মজুমদারের কাছ থেকে। এলাকার জমিদার আমজাদ আলী মজুমদারের কনিষ্ট পূত্র আজিজ মজুমদার যৌবনে সুযোগ পেলেই ঢাকা-কোলকাতা বেড়াতে যেতেন। ষাটের দশকে যখন গ্রামের বাড়ীতে আলাপ চারিতায় তিনি তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেন তখন আমরা কলেরগান (গ্রামোফোন) বাজিয়ে আব্বাস উদ্দিনের গান শুনতাম। চারপাশে জড়োহয়ে মানুষ তাঁর গান শুনতো। ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’ মহিলা শ্রোতাদের কাঁদাতো। আবার, এখনো দাদায় আমায় বিয়া করায় না সবাকে হাঁসাতো।
কালের ব্যবধানে মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাঁর পিতা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের সৃষ্ট ধারা অব্যহত রাখার পাশাপাশি তাকে আরো প্রসারিত করেছেন। আব্বাস উদ্দিন আহমেদ গান আর সূর নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নতুন গান আর সূর সৃষ্টি করেছেন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী গানের চর্চার পাশাপাশি গানের উপর গবেষনা করে সুনাম কুড়িয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতকে পরিচিত করেছেন।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের উপর তাঁর লেখা ৪৯টি বই মহামূল্যবান অবদান হিসেবে পরিগনিত হবে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত নজরুল-আব্বাস উদ্দিন স্মৃতিময় এলবাম এই দুই প্রান-পুরুষকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করবে। আজকের বাংলাদেশে্র ছন্দময় শিল্পসংস্কৃতির যে গৌরবোজ্জল অতীত রয়েছে তার দুই স্বার্থক রূপকার ছিলেন তাঁরা।
পিতা আব্বাস উদ্দিনের মত মুস্তাফা জামান আব্বাসীও মাটির মানুষ। সাধারন মানুষের জীবন, হাসি-কান্না, সুখ-দঃখ, চাওয়া-পাওয়া চিন্তা, চেতনা, গান এবং লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। এক শ্রেনীর শহুরে মানুষ গ্রামে বসবাসরত বৃহৎ জনগোষ্টির ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষা নিয়ে অনেক সময় ব্যঙ্গ করেন। লোকসঙ্গীত, পূর্ব বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও মুখের ভাষা যে বাংলা সাহিত্যের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে তাকে সমৃদ্ধ করেছে, তা হাতে কলমে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে শিল্পি আব্বাস উদ্দিন আহমেদ সৃষ্ট ধারা মুস্তাফা জামান আব্বাসী আরো এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁর রচিত বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের উপর গবেষনামূলক বইগুলো সেই ধারাকে আরো শানিত করতে পথ দেখাবে।
শহুরে পরিবেশে কেউ কেউ এখনো সাধারনের কথ্য ভাষা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে তারা বোঝেন না যে সাধারনের ভাষা এবং লোকজ ঐতিহ্য ও কৃষ্টি ছাড়া কোন ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারেনা। এই বোধ শহুরে ভদ্রলোকদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে আব্বাস উদ্দিন আহমেদের গানে গ্রামীন শব্দের ব্যবহার এক নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিল। এক শ্রেনীর ভদ্রলোকরা কল্পনাই করতে পারেননি পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক শব্দে ভরপুর ‘ফাঁন্দে পড়িয়া বগায় কান্দে রে’ বেতারে এবং গ্রামোফোন রেকর্ডে ঝড় তুলবে।
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর গাওয়া ও লেখা গান এবং তাঁর রচিত বইগুলো বাংলাদেশের লোকজ কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। একই কারনে বাংলাদেশে লোকজ সঙ্গীত ও সাহিত্যের সোনালী ভবিষ্যত নির্মানে তার এই কাজগুলো বিপুল অবদান রাখবে। সারা দুনিয়ায় মানুষ সোনালী ভবিষ্যৎ বিনির্মানের তাগিদে সঠিক পন্থা নির্ধারনের জন্য লোকজ ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাচ্ছে। আমাদের দেশে তার অন্যথা হতে পারেনা। আমরা গায়ক, লেখক ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সুস্বাস্থ্য কামনা করি যেন তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ আরো অনেক দিন অব্যহত রাখেন।
(প্রবন্ধটি প্রথম ছাপা হয় মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ৮০তম জন্মদিনে প্রকাশিত পুস্তকে। সাংবাদিক, লেখক এবং গবেষক মোস্তফা কামাল মজুমদার গ্রীনওয়াচ ঢাকা নামক ইংরেজী অনলাইন দৈনিকের সম্পাদক এবং ডেইলী নিউ এজ পত্রিকার পরামর্শক সম্পাদক। তিনি ইংরেজী দৈনিক নিউ নেশন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক।)

Share.
Loading...

Comments are closed.