
মিরপুর টেস্টের আজ তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হলো। যেমনটা ভাবা হচ্ছিল, তেমনই হয়েছে। আজ থেকেই উইকেট স্পিনারদের জন্য সহায়ক হয়ে উঠেছে। দুই দলের স্পিনাররাই বেশ দাপট দেখিয়েছে। তবে শেষ বিকেলে কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যাটিংও উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে বিপর্যয় ডেকে এনে কঠিন করে তুলেছে ম্যাচ। কিছুটা পিছিয়ে থেকেই তৃতীয় দিন শেষ করল স্বাগতিকরা।
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মিরপুরে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তৃতীয় দিনের খেলা শেষে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ ওভার ব্যাট করে ৬ উইকেট হারিয়ে ৭৯ রান করেছে বাংলাদেশ। দুই ইনিংস মিলিয়ে লিড দাঁড়িয়েছে ১০৬ রানের।
২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। তবে ব্যাটিংটা সুখকর হয়নি টাইগারদের। অপ্রয়োজনীয় শট খেলে উইকেট উপহার দিয়ে ফিরেছেন ব্যাটাররা। ৫০ রান পার করতেই ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশকে কিছুটা টেনে তোলার চেষ্টা করেন নাঈম হাসান আর জাকের আলী অনিক। ৩২ বলে ১৮ রানে জাকের আর ৩০ বলে ১৮ রানে অপরাজিত আছেন নাঈম।
ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। কোনো রান না করেই সামার জোসেফের বলে ফিরে যান ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম আর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত শুরুটা ভালোই পেয়েছিলেন। কিন্তু ইনিংস বড় করতে পারেননি দুজনই। ৩০ বলে ১৩ রান করে রোস্টন চেজের বলে বোল্ড হয়ে যান সাদমান আর ৩৭ বলে ১০ রান করেন শান্ত। তিনিও ফিরেছেন চেজের বলেই।
এরপর দেখেশুনে খেলতে হতো বাংলাদেশকে। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানহীন শট খেলে উইকেট উপহার দিয়ে আসেন তাওহিদ হৃদয় (২ বলে ০)। রোস্টন চেজের বলে ছক্কা হাঁকাতে চেয়েছিলেন তিনি। ধরা পড়েন জেইডন সিলসের হাতে। ৩৪ রানেই ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া বাংলাদেশকে এরপর কিছুটা স্বস্তিই যেন দিয়েছিল বৃষ্টি। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নামলে চা-বিরতি ঘোষণা করেন আম্পায়ার।
বিরতি থেকে ফিরেও থামেনি বাংলাদেশের যাওয়া-আসার মিছিল। দলকে উদ্ধার করা তো দূরে থাক আরও বিপদে ফেলে দিয়ে ফেরেন অভিজ্ঞ লিটন দাস। বিরতি থেকে পিরে প্রথম ওভারেই ক্যারিবীয়ান স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানের বলে এলবিডব্লিউয়ের শিকার হন লিটন। ১০ বলে ৪ রান আসে তার ব্যাট থেকে।
এরপর ব্যাটিংয়ে নেমে জাকেরের সঙ্গে জুটি গড়ার চেষ্টায় ছিলেন মিরাজ। কিন্তু সেই চেষ্টা বেশি দূর এগোয়নি। কিছুক্ষন পরই লিটনের পথ ধরেন মিরাজও। ৩২ বলে ৯ রান করে ওয়ারিকানের বলে বোল্ড হয়ে যান তিনি।
এতে ১০০ রানের লিড ছাড়ানোর আগেই গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে দলকে শতক ছাড়ানো লিড এনে দিয়েছেন তারা। সপ্তম উইকেটে ৪৪ বলে ২৬ রানের অপরাজিত জুটি গড়েছেন তারা। দিনের খেলা তখনো প্রায় ২৫ ওভারে মতো বাকি ছিল। কিন্তু মিরপুরের আকাশে অন্ধকার নেমে আসায় দেখা দেয় আলোকস্বল্পতা। এতে ৩টা ৩৩ মিনিটে আলোকস্বল্পতার কারণে বন্ধ হয় খেলা। সেটি আর শেষ পর্যন্ত চালু হয়নি। ৪টা ২৮ মিনিটে দিনের খেলা বন্ধ ঘোষণা করেন ম্যাচ অফিসিয়ালরা।
আগামীকাল সকালটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচে টিকে থাকতে হলে স্কোরবোর্ডে যোগ করতে হবে আরও কিছু রান। যদিও উইকেটের অবস্থা বলছে সেটি বেশ কঠিনই হবে। কারণ, আজই উইকেটে ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন স্পিনাররা। আজই দুই দল মিলিয়ে উইকেট পড়েছে ১২টি। এর মধ্যে স্পিনাররাই নিয়েছেন ১০টি।
এর আগে ৬ উইকেট হাতে রেখে ১৩৪ রান নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৪৫ বল খেলে ৪৩ রানে অপরাজিত থেকে মাঠে নামেন তেজনারায়ণ চন্দ্রপল আর ২২ বলে ১৫ রানে জাস্টিন গ্রেভস। দিনের প্রথম সেশনে দারুণ কাটিয়েছিল তারা। এই সেশনে বাংলাদেশ তুলতে পেরেছিল মোটে ২ উইকেট।
দিনের ১১তম ওভারে প্রথম উইকেট পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা তেজনারায়ণ চন্দ্রপলকে ফেরান শরিফুল ইসলাম। ইনিংসের ৫৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলে কাভার ড্রাইভ করতে চেয়েছিলেন চন্দ্রপল। তবে ব্যাটে-বলে সংযোগটা ঠিকমতো হয়নি। ব্যাট ছুঁয়ে বল চলে যায় স্লিপে থাকা শান্তর কাছে। সেটি তালুবন্দি করতে ভুল করেননি শান্ত। চন্দ্রপল ফিরেছেন ১৮৪ বলে ৫৬ রান করে।
এরপর আরেকটি উইকেটের জন্য আরও বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হয় বাংলাদেশকে। প্রথম সেশনের একদম শেষ বলে বাংলাদেশকে উইকেট এনে দেন নাঈম হাসান। এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন উইকেটে থিতু হওয়া ব্যাটার জাস্টিন গ্রেভসকে। গুড-লেন্থে পিচ করে কিছুটা নিচু হয়ে যাওয়া বল গিয়ে সোজ আঘাত করে গ্রেভসের প্যাডে। বাংলাদেশের আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ারও। ১০৩ বলে ৪৬ রান করে ফেরেন তিনি।
বিরতি থেকে ফিরে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। মাত্র ৮ ওভারের মধ্যেই তুলে নেয় বাকি ৪ উইকেট। নাঈমের স্পিন ঘূর্ণিতে পরাস্ত হয় সফরকারী ব্যাটাররা। তবে শুরুটা করেন মেহেদী হাসান মিরাজও। ৭৮তম ওভারের তৃতীয় বলে এগিয়ে এসে ড্রাইভ করতে চেয়েছিলেন জসুয়া বিশপ। তবে ব্যাটে-বলে সংযোগ করতে পারেননি। উইকেটের পেছনে থাকা লিটন দাস দ্রুত বল ধরে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন। ১১ বরে ১৫ রান করে আউট বিশপ।
এরপর ৮২তম ওভারে বোলিংয়ে এসে জোড়া উইকেট তুলে নেন নাঈম। ওভারের দ্বিতীয় বলে ফেরান নতুন ব্যাটার জামার জোসেফকে (১০ বলে ৪)। ওভারের শেষ বলে তুলে নেন জোমেল ওয়ারিকানের উইকেটও। ৪ বল খেলে রানের খাতা খোলার আগেই ফিরে যান ওয়ারিকান।
নিজের পরের ওভারে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের লেজ কেটে দেন নাঈম। শেষ ব্যাটার হিসেবে ফেরান জেইডন সিলসকে। ৫ বলে খেলে তিনিও ফিরেছেন শূন্য রানে। বাকিদের যাওয়া-আসার ভিরে একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই করেছেন ক্যারিবীয়ান অধিনায়ক রোস্টন চেজ। শেস পর্যন্ত মাঠ ছেড়েছেন ৬০ বলে ৪৩ রানে অপরাজিত থেকেই।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিজেদের প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় ৮২.৫ ওভারে। স্কোরবোর্ডে যোগ করতে পারেন ২৪৫ রান। ২৭ রানের লিড পায় বাংলাদেশ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (তৃতীয় দিন শেষে)
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৯৭.৪ ওভারে ২৭২/১০ (তামিম ৭, মুমিনুল ২৮, শান্ত ১৯, হৃদয় ৪২, সাদমান ১০৫, মিরাজ ১৫, নাঈম ৫, হাসান ৬, তাইজুল ১, শরিফুল০, লিটন ৩৪*; সিলস ১৩-৪-২৯-১, জোসেফ ১৫-৩-৪১-২, রোস্টন ১৩-১-৫৩-০, গ্রেভস ১০-৪-৩০-০, বিশপ ২৩-২-৬১-২, ওয়ারিকান ২৩.৪-৪-৫৩-৫)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস : ৮২.৫ ওভারে ২৪৫/১০ (কিং ১৫, ক্যাম্পবেল ৫৪, হজ ৭, আমির ০, চন্দ্রপল ৫৬, গ্রেভস ৪৬, বিশপ ১৫, জোসেফ ৪, ওয়ারিকান ০, সিলস ০, চেজ ৪৩*; হাসান ১১-১-৩৮-১, শরিফুল ১০-২-২৯-১, মিরাজ ২৫-৫-৬৫-২, তাইজুল ২৬-৩-৭৬-২, নাঈম ১০.৫-১-৩৩-৪)
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ২৯ ওভারে ৭৯/৬ (জাকের ১৮*, নাঈম ১৮*, সাদমান ১৩। চেজ ৩/২৫, ওয়ারিক্যান ২/১৯)।