
২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। হঠাৎ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী বাদ দিয়ে একজন আমলাকে মনোনয়ন দেওয়ায় খোদ আওয়ামী লীগের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়। নিজ জেলা পাবনায় এক অনুষ্ঠানে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করেন। এ নিয়ে তুমুল দেশে বিতর্ক শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনাকে পা ধরে সালাম করায় সাহাবুদ্দিনের ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা মূলত আলোচিত ‘ডামি নির্বাচন’ নামে পরিচিত। সেই নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে শপথবাক্য পাঠ করান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
এছাড়া ৫ আগস্ট হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসহসহ সকল উপদেষ্টাকে শপথ পড়ান সাহাবুদ্দিন। তবে এরপরে তিনি ছিলেন নিষ্ক্রিয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর তার কাছে শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রেখে দেওয়ায় বিতর্ক শুরু হয়।
সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যত কাণ্ড
২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। হঠাৎ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী বাদ দিয়ে একজন আমলাকে মনোনয়ন দেওয়ায় খোদ আওয়ামী লীগে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে তিনি নিজ জেলা পাবনায় এক অনুষ্ঠানে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করেন। এ নিয়ে তুমুল দেশে বিতর্ক শুরু হয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে পদচ্যুত করার দাবি উঠেছিল।
এরপর নানা সময়ে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন, তাঁর ‘নজরবন্দি’থাকার গুঞ্জন এবং শারীরিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পদত্যাগের খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। সম্প্রতি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আবারও তাঁর পদ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে।
শুরুতেই বিতর্ক: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা না দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে।
শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম
রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনেক আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করেন সাহাবুদ্দিন। সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ছবিটি নতুন করে ভাইরাল হয়। সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, একজন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নিরপেক্ষতার প্রতীক হওয়ার প্রত্যাশা থাকে। সেই জায়গায় এমন একটি ছবি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা এটিকে ব্যক্তিগত সম্মান প্রদর্শনের বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন বলেন, এটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়।
‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে সাহাবুদ্দিনের আইডি থেকে করা ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’মন্তব্যের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়।
মন্তব্যটি সত্যিই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে করা হয়েছিল কি না, সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে স্ক্রিনশটটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এটি রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও জনপরিসরে যে কৌতূহল ও সমালোচনা তৈরি হতে পারে, এই ঘটনাটি তার একটি বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
এই ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। যদিও শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, এরপরই শুরু হয় আরও বড় বিতর্ক।
সাক্ষাৎকার, অনেক বিতর্ক
২০২৪ সালের অক্টোবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি।
এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কারণ ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে সেই বিবরণ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলেন, রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্য মন্তব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বঙ্গভবন ঘেরাও
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও পালন করেন। নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে এ ধরনের আন্দোলন খুবই বিরল। ফলে ঘটনাটি রাষ্ট্রপতিকে নিয়েই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
সরকারের ভেতর থেকেও আসে ভিন্ন সুর
এই বিতর্কের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি না করাই উচিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, সরকার পরিবর্তনের বাস্তবতা এবং পরবর্তী সাংবিধানিক কার্যক্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সময়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও বলেন, এখন মূল বিষয় হওয়া উচিত রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন; পদত্যাগপত্র আছে কি নেই—এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে আটকে থাকা সমাধান নয়।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও মূলত একই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়—পদত্যাগের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতিকে সরানো হবে কি না—সাংবিধানিক বিতর্ক
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে, তাঁকে সরানো সম্ভব কি না। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে সে সময় অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে সরানো সহজ নয়। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন সংসদ, নতুন বিতর্ক
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক দেখা দেয়।
সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং নতুন সংসদেও তা ফিরে আসে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি তাঁদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই থেকেছেন এবং খুব কমই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন।
সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছু ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো কার্যকলাপ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পরে দেওয়া সাক্ষাৎকার—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন, যাঁকে ঘিরে বিতর্ক কখনোই পুরোপুরি থামেনি।
শেখ হাসিনার সাথে ফোনালাপ
সর্বশেষ বর্তমান সরকার তাকে রেখে দেওয়ার চিন্তা করলেও লন্ডনে চিকিৎসার জন্য গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে ফোনালাপের বিষয়টি ধরা পড়ে। শুরু হয় নতুন বিতর্ক। যার পরিণতিতে তাকে বিদায় নিতে হয়।
মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাবনায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তিনি কারারুদ্ধ হন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
১৯৮২ সালে তিনি বিসিএস (বিচার) বিভাগে যোগ দেন এবং ১৯৯৫ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এছাড়াও, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর মানুষদের হত্যা, ধর্ষণ, চুরি এবং অন্যান্য অপরাধের তদন্তকারী বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দীন। বিচারকের বিভিন্ন পদে চাকরি শেষে ২৫ বছর পর তিনি ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গত জাতীয় কাউন্সিলে তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহাবুদ্দিন ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) থেকে এলএলবি এবং একই প্রতিষ্ঠান থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী অধ্যাপক ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৩ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী ও নিষিদ্ধঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।