News update
  • Cold wave disrupts life, livelihoods across northern Bangladesh     |     
  • US to Exit 66 UN and Global Bodies Under New Policy Shift     |     
  • LPG Supply Restored Nationwide After Traders End Strike     |     
  • Stocks advance at both bourses; turnover improves     |     
  • LCs surge for stable dollar, but settlement still sluggish     |     

হালচাল: মার্চ ২৪,২০২৫ জীবন দক্ষতায় ইউ টার্ন

প্রবাস 2025-04-02, 11:20pm

nazrul-islam-enayetpur-d535aa1c26118458cd6080737a9f5aca1743614405.jpg

Nazrul Islam.



১ ) কানাডায় সড়কে গাড়ি নিয়ে বের হলে ইন্টারসেকশন গুলিতে (No U turn নো ইউ টার্ন ) সাইন দেখা যায় ,অর্থাৎ ইউ টার্ন বা গাড়ি ঘুরানো যাবে না । যাত্রী ভুল করে অথবা হঠাৎ করে মত পরিবর্তন করে ইউ টার্ন নিয়ে ফিরে যেতে চাইলে এই নির্দেশ মেনে চলতে হয়। যেহেতু সড়ক ব্যস্ত, পেছনে অনেক গাড়ি থাকে,তাই ইচ্ছে করলেই ইউ টার্ন (গাড়ি ঘুরানো) যায় না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ক্যামেরা বসানো থাকে, ভুল করে অমান্য

করলে বাসার ঠিকানায় জরিমানার নোটিশ চলে আসবে; তাছাড়া পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনায় ফেলে দিতে পারে।

২ ) এমনিভাবে মানুষের জীবনে ও ‘ইউ-টার্ন’ প্রয়োজন আছে- মানুষের চিন্তা ও মতের পরিবর্তন হয়; এটাই নিয়ম। আমাদের বাংলাদেশ চিত্র-নাট্য এবং সিনেমা অভিনেতা ‘আবুল হায়াৎ’ একজন প্রকৌশলী, ১৯৬৭ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পাশ করে অভিনেতা ও নাট্যকার হিসাবে নাম করেছেন। আমাদের এর এক মেধাবী লেখক আনিসুল হক যিনি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ও এই লাইন পছন্দ না করে একজন

লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি।

৩ ) কানাডা বা আমেরিকাতে আমাদের এশিয়া,ইউরোপ বা আফ্রিকা থেকে যে সব লোক যত বড় পেশাদারি ডিগ্রী যেমন: ইঞ্জিনিয়ার,ডাক্তার,কৃষি বা যে কোনো পড়াশুনা নিয়েই আসুক না কেন,পুনরায় পড়াশুনা না করলে নিজের লাইনে সুবিধামতো কাজ পাওয়া কঠিন। এ দেশে ও অনেকে পড়াশুনা করে কাজ না পেয়ে শেষে অন্য পেশায় পড়াশুনা ও প্রশিক্ষন নিয়ে কাজ পাল্টায়। আমার মনে পড়ে ১৯৯০র দিকে আমি টরোন্ট জর্জ ব্রাউন কলেজে একটা কোর্স করি , আমার পাশেই একটা ক্যানাডিয়ান ২৪-২৫ বৎসরের যুবক বসে একই কোর্স করছে ; আমি একদিন ওকে প্রশ্ন করি, তোমার একাডেমিক ক্যারিয়ার কি ? সে বলে আমি টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্স নিয়ে মাস্টার্স করেছি। আমি জিজ্ঞেস করাতে সে বলে এ দেশে একটা ডিগ্রী নিয়ে অনেক সময় ভালো করা যায় না। ক্লাসে ২৪-২৫ জন ছাত্র-ছাত্রীর (দুই -এক জন বাদ দিয়ে) আমার মতো সবাই বিভিন্ন দেশের, ভালো পড়াশুনা ও ভালো চাকুরী করে ইমিগ্রেশন নিয়ে এসে এখানে পড়াশুনা করার উদ্দেশ্য এ দেশের চাকুরীর বাজারে ঢুকা। আমাদের দেশের কৃষি প্রকৌশলী (এগ্রিকালটারেল ইঞ্জিনিয়ার ) দের অনেকেই ও সব লাইন বাদ দিয়ে ইউনিভার্সিটি থেকে ফ্রেশ সমাজকল্যাণ স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে জব মার্কেটে ভালো করছে।

৪ ) বিভিন্ন দেশ থেকে কানাডা বা আমেরিকায় আসা লোকজনের জন্য কেউ কাজ খুঁজে রাখে না ,নিজেকে তার ব্যবস্থা করতে হয়।একজন অল্প শিক্ষিত বা বড় ডিগ্রিধারী যাই হোক না কেন, এখানে প্রথম দিকে সবাই সমান, কেউ আসার পর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় না, বা দিলে ও সেটা কয়েকদিনের জন্য। খোঁজ খবর নিয়ে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। যদি কেউ সিঙ্গেল হিসাবে আসে তার জন্য কষ্ট কম,যতটা না

পরিবার নিয়ে আসলে হয়ে থাকে। পয়সা নিয়ে আসলে সে ক্ষেত্রে আলাদা,তবে পয়সা না থাকলে, সিঙ্গেল হলে কারো না কারো সঙ্গে বা এখানে সেখানে থেকে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা করতে হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে বিভিন্ন এজেন্সি,দোকান,কলকারখানা ধর্ণা দিয়ে ভাগ্য ভালো হলে কাজ পেতে পারে। টেকনিকাল হাতের কাজ শিখলে হয়তো কাজের ব্যবস্থা হতে পারে ;ঠেলায় পড়লে সবই সম্ভব,সবাই এ দেশে কাজ ও পড়াশুনা করে । কিন্তু

আমাদের দেশগুলিতে পড়াশুনার সুযোগ না থাকাতে বা সীমিত সুযোগের জন্য  লোকজন পার্ট-টাইম কোনো কাজ শিক্ষার সুযোগ পায় না।

৫ ) ১৯৭০ বা ১৯৮০র দিকে আমাদের দেশে শিক্ষিত লোকেরা কেউ টাইপ শিখতো না, টাইপ শিখবে তো টাইপিস্ট। কিন্তু এ দেশে ছেলেমেয়েরা স্কুলে সবাই টাইপ শিখে ,টাইপ না জানলে, কম্পিউটার দিয়ে কাজ করা কঠিন এবং নতুনদের জন্য কলেজে গিয়ে টাইপ এবং কম্পিউটার শিখতে অনেক সময় লাগে। আমাদের দেশে টেকনিকাল লাইন নিয়ে যারা পড়াশুনা করে, তাদের জন্য বিদেশে কাজ পাওয়া সহজ;দেশের এম এ বা বিএ পাশ এ দেশে সরাসরি কোনো কাজে আসে না,ফলে এ জাতীয় লোকদের সমস্যা বেশি । যে কোনো লোককেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগে। আমাদের দেশে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে এ দেশে কাজ না পেয়ে অনেকেই শেষে টেক্সি ড্রাইভিং শিখে রাতারাতি বাড়ি গাড়ি কিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

৬ ) পৃথিবীর ধনী দেশগুলিতে সিনিয়র লোকদের দেখাশুনার জন্য কেয়ার- টেকার দরকার হয়। টরন্টো শহরে ফিলিপিনেজ পুরুষ ও মহিলাদের এ কাজে বেশি বেশি দেখা যায় ,ঘন্টা নিয়মে ওভারটাইম সহ এ কাজ করে ।

আমার প্রতিবেশী ‘মারিয়া’ ৯০র বেশি বয়স, এখনও লাঠি বা হুইল চেয়ার নিয়ে কি প্রচন্ড শীত এবং প্রচন্ড বরফ উপেক্ষা করে বাহিরে সকাল এবং বিকেলে হাঁটতে বের হয় । আজকাল সে একা বের হয় না,সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক (care taker ) এলেনা নামের ৩০-৩৫ বৎসরের একজন ফিলিপিনেজ মহিলা তার দেখাশুনা করে।

পুরা কানাডা, ইউরোপ,আমেরিকা বা মিডল ইস্ট- সর্বত্র ওরা (ফিলিপিনেজ) এই চাকুরী করে দেশে মোটা অংকের রেমিট্যান্স পাঠায়। সে অনেক কথা -এই মারিয়ার সঙ্গে আমার ও পরিবারের অন্তরঙ্গ গত ২৫ বৎসরের,সে আমাদের পারিবারিক বন্ধু ।তার স্বামী বহুদিন হয় মারা গেছে,সে প্রতি মাসে একবার করে তার স্বামীর সমাধি পাশে ফুল নিয়ে দাঁড়াতো । কাউকে বিরক্ত করতো না, বাসে যাওয়া- আসা করতো। মনে পড়ে একবার প্রচন্ড শীত ও বরফে সে বাস স্টান্ডে দাঁড়িয়ে আছে,আমি এবং আমার স্ত্রী কোথায় ও যাচ্ছি; আমার স্ত্রী বলে- হায় মারিয়া ! আমি ওকে তার স্বামীর সমাধির পার্শে নামিয়ে বলি-আমরা অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। সে বলে-তোমরা চলে যাও, আমি কিছু সময় আমার স্বামীর সমাধি পার্শে থাকবো। কানাডার ঠান্ডা ও বরফ,যে এ দেশে না আসে, উপলব্ধি বা বুঝানো কঠিন। হায়রে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও ফুলের মূল্য ! আজকাল কি এই ভালোবাসা পৃথিবীর কোথায় ও আছে?

৭ ) গত ৩৮ বৎসরের কানাডা জীবনে কোনো বাংলাদেশী মহিলা কেয়ার টেকারের কাজ করতে দেখি নি বা হয়তো এ দেশে এসে কমিউনিটি কলেজে কাজ শিখে কোথায়ও কোথায়ও করে ,আমার জানা নেই,আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এ সব কাজ শিখলে বিদেশে গিয়ে কাজ করতে পারে। অত্যন্ত হালকা কাজ –সিনিয়রদের  দেখাশুনা, খাওয়াদাওয়া, বাহিরে হাঁটানো,বেডশীট পরিবর্তন, গোছল করানো । দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ এবং অতিরিক্ত কাজ করলে ওভারটাইম পাওয়া যায়। শপিং মলে গেলে এ সব মহিলাদের দেখা যায় ; সাবলীল ইংরেজি বলে, দেশে ভালো পড়াশুনা করে এসে এ সব দেশে কাজ করে এবং খুবই আলাপী। জাপান,ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং , আমেরিকা বা কানাডা -এই চাকুরী নিয়ে ওদের অনেকেই যায় । আমি সেদিন ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস হেবের একটা বক্তব্য থেকে এ সম্পর্কে শুনলাম, উনি অনেক দেশের খোঁজখবর রাখেন। কানাডাতে নার্সের অভাব, ফিলিপিনা মহিলারা এই কাজে কৃতকার্য ,অথচ আমাদের দেশের লোকজন হয়তো জানেনা বা সুযোগ পায় না। আজকাল ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার সাথে যে কোনো হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ (হ্যান্ডস অন ট্রেনিং ) বা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষন নিতে হয়। সেদিন ইউনুস সাহেবকে বলতে শুনেছি,আমাদের দেশে এত এত ইউনিভার্সিটি,যদি প্রতিটি ডিগ্রির সঙ্গে নার্সিং শিখানো হতো,তাহলে ওরা বিদেশে কাজ পেতে সুবিধা হতো অথবা আমাদের দেশে ও কাজ করতে পারতো ; কানাডাতে নার্সের অভাব। আজকাল সাদা কাজ (white collar job ) সুদূর স্বপ্ন, তাছাড়া সীমিত আয়ে সংসার খরচ চলেনা , সে জন্য আমাদের সমাজে ঘুষ প্রথার মতো মারাত্বক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার সঙ্গে বিশেষ কোনো

ট্রেনিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা দরকার ।

৮) আমাদের দেশে এখনও সব ছেলেমেয়ে পড়াশুনার সমান সুযোগ পায় না। আমি ৪৩ বৎসর পূর্বে যে সব দারিদ্র পরিবারকে দেখেছি, আজও তাদের ছেলেমেয়ে বা নাতিনাতনিদের সে একই অবস্থায় বা আরও খারাপ অবস্থায় দেখি। ঢাকা ও বিভিন্ন শহরের বস্তিগুলির দিকে তাকালে বুঝা যায় লোকজন কতখানি ভালো বা মন্দ অবস্থায় আছে। আজকাল শহরের অলিতে -গলিতে চিহ্নমূল লোকদের খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে দেখা যায়।

এক ধরণের দুর্নীতিবাজ লোক বিলিয়ন্স ও ডলার বিদেশে পাচার করে,অপরদিকে দেশে লক্ষ লক্ষ লোক না খেয়ে খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়- এটাই কি আমাদের ধর্মে বলে ? আমাদের দেশে এ সব অনাচার,দুর্নীতিবাজদের হাত এতই লম্বা, তাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলা যায় না,সাধারণ মানুষ এদের থেকে দূরে ও ভীতু থাকে । আমরা মুসলমান- ধর্মে বলে এক, করি তার বিপরীত। এই পশ্চিমা দেশগুলিতে,ওরা মুসলমান নয়, তবে ওজনে কম দেবে না বা মিথ্যা কথা বলবে না। এরা আমাদের মতো ধর্ম পালন করে না, তবে আমাদের

ধর্মের অনেক নিয়ম মেনে চলে। এরা পরিশ্রম করে,নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যায়-আমরা ধর্ম নিয়ে না বুঝে মনগড়া কথা বলে ঝগড়া বাধাই। আমাদের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান -স্কুল ,কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং মাদ্রাসাগুলিতে কারিগরি শিক্ষায় ঢেলে সাজানো প্রয়োজন,তা না হলে এ দেশ দারিদ্রতা থেকে ‘ইউ টার্ন’ নেবে না ।

সমাপ্ত