
বৃষ্টির এক মায়াবী হাতছানি আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এমন আবহে বই হাতে জানালার পাশে বসা কিংবা এক কাপ চায়ে চুমুক দেওয়াটা যেমন প্রশান্তির, তেমনি আরেকটা বিষয় খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ভর করে, আর তা হলো ক্লান্তিহীন এক ঘুম ঘুম ভাব। অনেকের কাছেই মনে হয়, বৃষ্টির দিনে বিছানার টান অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির দিনে এই অকারণ অলসতা বা ঘুমের অনুভূতি কেবল মানসিক নয়, এর পেছনে রয়েছে শরীরতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ।
মেলাটোনিন হরমোনের প্রভাব ও সূর্যালোকের অভাব আমাদের শরীরে ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে 'মেলাটোনিন' নামক একটি হরমোন। সাধারণত অন্ধকারে এই হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা আমাদের ঘুমানোর সংকেত দেয়। বৃষ্টির দিনে আকাশ মেঘলা থাকায় সূর্যের আলো সরাসরি পৃথিবীতে আসতে পারে না। দিনের বেলাতেও চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকায় শরীরের জৈবিক ঘড়ি বিভ্রান্ত হয় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মেলাটোনিন উৎপন্ন করে। ফলে শরীরে ক্লান্তি অনুভূত হয় এবং চোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম নেমে আসে।
বৃষ্টির শব্দের জাদুকরী সুর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দকে বিজ্ঞানের ভাষায় অনেক সময় 'পিঙ্ক নয়েজ' (Pink Noise) বা প্রশান্তিদায়ক শব্দ বলা হয়। এই একঘেয়ে অথচ ছন্দময় শব্দ মস্তিষ্ককে বাইরের অন্যান্য কর্কশ শব্দ থেকে আড়াল করে ফেলে। এটি আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে শান্ত করে এবং মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গ তৈরি করে, যা গভীর বিশ্রামের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে বৃষ্টির শব্দ আমাদের অবচেতন মনে ঘুমের এক আবহ তৈরি করে দেয়।
তাপমাত্রা হ্রাস ও পরিবেশের শীতলতা বৃষ্টির ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই শীতল আবহাওয়া শরীরের বিপাকক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করে দেয় এবং শরীরকে বিশ্রামের মোডে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। গরমের অস্থিরতার বদলে চারপাশের ঠান্ডা পরিবেশ পেশিকে শিথিল করে দেয়, যা আরামদায়ক ঘুমের জন্য আদর্শ একটি পরিস্থিতি তৈরি করে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তি ও অলসতা পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির দিনে সাধারণত বাইরের কাজকর্মে স্থবিরতা নেমে আসে। বাইরে যাওয়ার ঝামেলা কম থাকায় মনের ওপর চাপ কমে যায় এবং এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি কাজ করে। এই কাজের চাপমুক্ত পরিবেশ শরীর ও মনকে অলস করে তোলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আমাদের গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।