
মাথায় সোনালি চুলের বাহারি গুচ্ছ, ধবধবে সাদা অবয়ব আর চালচলনে এক রাজকীয় ভাবসাব! বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করা অ্যালবিনো প্রজাতির সেই বিখ্যাত সাদা মহিষ ‘ট্রাম্প’ এখন ঢাকার মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায়। নামের কারণে কোরবানি থেকে রক্ষা পাওয়া এই শ্বেতহস্তী সদৃশ মহিষটি এখন পুরোদস্তুর ভিআইপি। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের বিশেষ খাতির আর ‘জামাই আদরে’ খাঁচায় বসে এখন রীতিমতো আয়েশি জীবনযাপন করছে।
এবারের ঈদুল আজহার ছুটিতে মিরপুর চিড়িয়াখানার হাজারো দর্শনার্থীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই মহিষটি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধু তাকে এক পলক দেখার জন্যই ছুটে আসছেন। খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে সেলফি তোলা, খুনসুটি করা আর রঙ্গরসে মেতে ওঠার ধুম পড়েছে। দর্শকরা অবলা মহিষটিকে টিপ্পনি কাটতেও ছাড়ছেন না।
‘জামাই আদরে’ আছে ট্রাম্প!
চিড়িয়াখানায় এই মহিষটির পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, ভাইরাল এই সাদা মহিষটির যত্ন, রাজকীয় আবদার আর রাজভোগের বহর দেখে মনে হতেই পারে সে কোনো শ্বশুরবাড়িতে জামাই আদরে আছে! একে জামাই আদর বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।
চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, ‘এল-০৭’ নম্বর খাঁচায় ঠাঁই পাওয়া এই মহিষের দৈনিক খাদ্যতালিকায় রয়েছে ২৫ কেজি তাজা সবুজ ঘাস এবং ৫ কেজি পুষ্টিকর ছোলা-ভুসি। সেইসঙ্গে ২৪ ঘণ্টা মিলছে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি। রঞ্জক পদার্থ বা মেলানিনের জন্মগত ঘাটতির কারণে এই অ্যালবিনো প্রজাতির প্রাণীদের ত্বক ও চোখ সাধারণ মহিষের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়। সাধারণ কালো মহিষের তুলনায় এদের চামড়াও বেশ পাতলা। তাই তার জন্য তৈরি করা হয়েছে রোদ-বৃষ্টি প্রতিরোধী বিশেষ শেড। আর খাঁচার ভেতরের তীব্র গরম কমাতে পাইপের মাধ্যমে দিনে দুই থেকে তিনবার স্পেশাল গোসল করিয়ে তার শরীর ঠান্ডা রাখা হচ্ছে।
চলছে রাজকীয় চিকিৎসা
চিড়িয়াখানার এক পশু চিকিৎসক জানান, ট্রাম্প নামের মহিষটি বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থ ও চনমনে আছে। তবে কোরবানির হাটে তোলার কারণে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা-নেওয়ার সময় চামড়া পাতলা হওয়ায় ঘষাঘষিতে শরীরে একটি সাধারণ ক্ষত তৈরি হয়েছে। এটি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই; মহিষটির জন্য বিশেষ মেডিকেল কেয়ার ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ব্যবস্থা চলছে।
চিড়িয়াখানার পাবলিসিটি অফিসার মো. সোহরাব আল রুবাইত বলেন, ‘গত বুধবার রাতে এই বিশেষ সাদা মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিশেষ অনুরোধ ও সরকারের অনন্য উদ্যোগে এটিকে আজীবন সংরক্ষণের জন্য এখানে রাখা হয়েছে। এর ত্বক ও চোখের সংবেদনশীলতার কারণে আমরা একে সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণে রাখছি।’
দর্শনার্থীদের রসিকতা ও টিপ্পনি
মাথায় সোনালি চুলের স্টাইল আর গায়ের ধবধবে সাদা রঙের অদ্ভুত মিলের কারণে খামারিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে এর নামকরণ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই মহিষকে নিয়ে খবর হয়েছিল। এখন চিড়িয়াখানার খাঁচার সামনে এসে দর্শনার্থীরাও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এর তুলনা করে নানান টিপ্পনি কাটছেন।
খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আরাফাত নামে এক দর্শনার্থী রসিকতা করে বলেন, ‘সাদা এই মহিষটির নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর ওর ভাবসাবও দেখি ঠিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতোই! চিড়িয়াখানায় এসেও যেন রাজকীয় স্টাইল দেখাচ্ছে।’
পাশ থেকে সাব্বির নামের আরেক দর্শনার্থী হেসে যোগ করেন, ‘বিশ্বের ভাইরাল মহিষ বলে কথা! তার ওপর আবার বিশ্বনেতার সঙ্গে চেহারার মিল আছে। সুতরাং তাকে আয়েশে রাখাটা আমাদের সবারই দায়িত্ব। ট্রাম্প এখন ঘুমাচ্ছে, একে ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। ঘুমাও ট্রাম্প, ঘুমাও!’
ঈদের এই তপ্ত দুপুরে চারপাশের হাজারো মানুষের কোলাহল আর রসিকতার মাঝেও ‘মহিষ ট্রাম্প’ কিন্তু নিজের রাজকীয় মেজাজ হারায়নি। সে তার কাস্টমাইজড শেডের নিচে বসে পরম আয়েশে জাবর কেটে চলেছে, যেন সে সত্যিই জানে—সে সাধারণ কোনো মহিষ নয়, সে চিড়িয়াখানার নতুন ‘সেলিব্রিটি’!