
মোস্তফা কামাল মজুমদার
মোস্তফা কামাল মজুমদার
স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বর্তমান বাংলাদেশে গণমাধ্যম ইকোসিস্টেম বা গণমাধ্যম ব্যবস্থা একটি চরম ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মূলধারার প্রায় সমস্ত গণমাধ্যম এখন হয় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মুখপত্র, না হয় বৃহৎ করপোরেট, ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার। এই দ্বিমুখী চাপের কারণে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গণমাধ্যমের এই করপোরেট ও দলীয় মেরুকরণের বিপরীতে একটি সুস্থ, জনমুখী এবং ভারসাম্যপূর্ণ গণমাধ্যম ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য সামাজিকভাবে মালিকানাধীন গণমাধ্যম আজ সময়ের দাবি। সামাজিকভাবে মালিকানাধীন গণমাধ্যম বলতে এমন প্রকাশনা বা সংবাদ সংস্থাকে বোঝায়, যা কোনো একক ব্যক্তি, করপোরেট মুনাফাভোগি বা সরকারের অধীনে পরিচালিত হয় না; বরং এটি পাবলিক ট্রাস্ট, অলাভজনক ফাউন্ডেশন, পাঠক-সাংবাদিক সমবায় বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে মুনাফার চেয়ে জনসেবা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা অগ্রাধিকার পায়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে সামাজিকভাবে মালিকানাধীন বা ট্রাস্ট-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের একটি উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায় ছিল। ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ১, রাজউক এভিনিউ (তৎকালীন ডিআইটি এভিনিউ) ছিল দেশের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর তৎকালীন পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্টের ধারাবাহিকতায় এটি রূপান্তরিত হয় এবং এখান থেকে প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ টাইমস এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই প্রকাশনাগুলো বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক অনন্য মানদণ্ড স্থাপন করেছিল।
১৯৭৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত যখন দেশে মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছিল, তখন সাময়িকভাবে দৈনিক ইত্তেফাক অফিসকেও হাটখোলার আর. কে. মিশন রোড থেকে এই ১ রাজউক এভিনিউ ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছিল। অন্যদিকে, তোয়েনবি সার্কুলার রোডের নিজস্ব ভবন থেকে বাংলাদেশ অব্জারভার পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ইত্তেফাক তার মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ অবজারভারও তার মূল মালিকানায় ফিরে যায়।
তবে দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ টাইমস এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা এই ট্রাস্টের অধীনেই নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকাগুলো ছিল সম্পূর্ণ নির্দলীয় এবং অলাভজনক। ক্ষমতাসীন সরকার স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি কাভারেজ পেত, কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল বা সামাজিক সংগঠনগুলোর মতামত ও সংবাদ কখনোই এখানে চেপে রাখা হতো না। কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা বাণিজ্যিক মুনাফার তাড়না না থাকায় এই পত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্যের প্রধান ধারক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ট্রাস্টের পত্রিকাগুলো পরিচালনা করতেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও অত্যন্ত দক্ষ, সৎ এবং পেশাদার সাংবাদিকগণ, যাদের মধ্যে কাজ করত এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্রত (Missionary Zeal)। এছাড়া, সামাজিকভাবে মালিকানাধীন এই মিডিয়া হাউসগুলোই দেশে প্রথম সরকারি ওয়েজবোর্ড বা সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়ন করেছিল, যা পরবর্তীতে বেসরকারি করপোরেট মিডিয়া হাউসগুলো অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।
১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রার মতো কালজয়ী প্রকাশনাগুলো বন্ধ করে দেয়। এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রেস ট্রাস্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে বন্ধ তিনটি পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায় শুধু তাই নয়, মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার এই মূল্যবান ট্রাস্ট সম্পত্তি ও ভবনটি সরকার নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় এবং সেখানে স্থাপন করা হয় সরকারি মালিকানাধীন 'কর্মসংস্থান ব্যাংক'।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল স্বাধীন গণমাধ্যম ও মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার জন্য কুখ্যাত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাদের পক্ষে ১৯৯৭ সালের সেই বেআইনি ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তকে বহাল রাখা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। একটি গণমুখী ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে গঠিত এই সরকার কোনোভাবেই একটি স্বাধীন প্রেস ট্রাস্টের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করে রাখতে পারে না। এই সম্পত্তি অবিলম্বে প্রকৃত সাংবাদিক সমাজ ও ট্রাস্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং টাইমস বাংলা প্রেস ট্রাস্টকে পুনরুজ্জীবিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক সময়ে অপসাংবাদিকতা, ভুয়া খবর এবং উসকানিমূলক রিপোর্টিং বন্ধের জন্য সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনকে আরও শক্তিশালী করার কথা ভাবছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আইন বা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়ের মাধ্যমে কখনো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা যায় না; বরং তা উল্টো ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। যদি দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গণমাধ্যম ইকোসিস্টেম থাকে, তবে গণমাধ্যমের ভেতরেই একটি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ (Built-in checks and balances) ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
সামাজিকভাবে মালিকানাধীন গণমাধ্যম যখন বাজারে থাকবে, তখন করপোরেট বা দলীয় গণমাধ্যমগুলো চাইলেই যেকোনো মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন করতে পারবে না। কারণ, ট্রাস্ট-চালিত মিডিয়াগুলোর বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে পাঠক প্রোপাগান্ডাকে সহজেই বর্জন করবে। প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে তখন বেসরকারি মাধ্যমগুলোও সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হবে। ফলে কোনো কঠোর আইন ছাড়াই মিডিয়ার অপব্যবহার ও অনৈতিকতা দূর হবে এবং সমাজ দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে করপোরেট একাধিপত্যের বাইরে গণমাধ্যমের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিভিন্ন সামাজিক, অলাভজনক ও সমবায়ভিত্তিক মালিকানার মডেল সফলভাবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকাটির মালিকানায় রয়েছে 'স্কট ট্রাস্ট', যেখানে মুনাফা অর্জনের কোনো তাগিদ নেই এবং সমস্ত আয় সাংবাদিকতাতেই পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। ফ্রান্সে 'ল্য মঁদ' পরিচালিত হয় সাংবাদিক ও পাঠকদের একটি সফল সমবায়ের মাধ্যমে, যা এর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর' একটি ধর্মীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টের অধীনে থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদে অনন্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখছে।
এছাড়াও আমেরিকার মেট্রোপলিটন সাংবাদিকতায় 'দ্য ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার' অলাভজনক লেনফেস্ট ইনস্টিটিউট দ্বারা এবং 'ট্যাম্পা বে টাইমস' খ্যাতনামা পয়ন্টার ইনস্টিটিউট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে 'শিকাগো সান-টাইমস' অলাভজনক পাবলিক রেডিওর সাথে যুক্ত হয়ে এবং 'দ্য সল্ট লেক ট্রিবিউন' আমেরিকার প্রথম মূলধারার দৈনিক হিসেবে পুরোপুরি ৫০১(সি)(৩) পাবলিক চ্যারিটি মডেলে রূপান্তর হয়ে ইতিহাস গড়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে 'দ্য টেক্সাস ট্রিবিউন' অনুদান ও সাবস্ক্রিপশনের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার এক অনন্য বৈশ্বিক মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এমনকি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা 'অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস' (AP) কোনো ব্যক্তিগত করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি অলাভজনক নিউজ কো-অপারেটিভ। যুক্তরাজ্যের বামপন্থী দৈনিক 'মর্নিং স্টার' পাঠক ও ট্রেড ইউনিয়ন সমবায়ের (PPPS) মাধ্যমে এবং ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত 'কো-অপ নিউজ' বিশ্বের প্রাচীনতম সমবায় সংবাদপত্র হিসেবে আজও সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এই বৈশ্বিক উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, করপোরেট পুঁজির দাসত্ব না করেও কীভাবে উচ্চমানের এবং প্রভাবশালী সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বৈশ্বিক মডেল: পশ্চিমা গণতন্ত্রে সামাজিক মালিকানাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে করপোরেট একাধিপত্যের বাইরে গণমাধ্যমের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিভিন্ন সামাজিক, অলাভজনক ও সমবায়ভিত্তিক মালিকানার মডেল সফলভাবে কাজ করছে।
সংবাদপত্রের নাম
দেশ
মালিকানার ধরণ / মডেল
দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)
যুক্তরাজ্য
স্কট ট্রাস্ট (The Scott Trust): মুনাফা অর্জনের কোনো তাগিদ নেই, সকল আয় সাংবাদিকতায় পুনর্বিনিয়োগ করা হয়।
ল্য মঁদ (Le Monde)
ফ্রান্স
সাংবাদিক ও পাঠক সমবায়: সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মালিকানা সরাসরি সাংবাদিক ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে।
দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর
যুক্তরাষ্ট্র
ধর্মীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান: আন্তর্জাতিক সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত।
দ্য ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার
যুক্তরাষ্ট্র
লেনফেস্ট ইনস্টিটিউট ফর জার্নালিজম: নাগরিক মডেলের সাংবাদিকতা, সম্পূর্ণ অলাভজনক।
ট্যাম্পা বে টাইমস (Tampa Bay Times)
যুক্তরাষ্ট্র
পয়েন্টার ইনস্টিটিউট (Poynter Institute): সাংবাদিকতা শিক্ষার অলাভজনক স্কুল দ্বারা পরিচালিত।
শিকাগো সান-টাইমস
যুক্তরাষ্ট্র
শিকাগো পাবলিক মিডিয়া (NPR অধিভুক্ত): অলাভজনক পাবলিক রেডিওর সাথে যুক্ত হয়ে পাবলিক চ্যারিটি মডেল।
দ্য সল্ট লেক ট্রিবিউন
যুক্তরাষ্ট্র
501(c)(3) পাবলিক চ্যারিটি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মূলধারার দৈনিক যা পুরোপুরি চ্যারিটিতে রূপান্তরিত হয়।
দ্য টেক্সাস ট্রিবিউন
যুক্তরাষ্ট্র
ডিজিটাল-ফার্স্ট অলাভজনক সংবাদ সংস্থা: অনুদান ও সাবস্ক্রিপশন নির্ভর রাজনৈতিক সাংবাদিকতার সফল মডেল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)
যুক্তরাষ্ট্র
অলাভজনক সংবাদ সমবায়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র ও ব্রডকাস্টারদের যৌথ মালিকানাধীন নিউজ কো-অপারেটিভ।
মর্নিং স্টার (Morning Star)
যুক্তরাজ্য
পিপলস প্রেস প্রিন্টিং সোসাইটি (PPPS): পাঠক এবং ট্রেড ইউনিয়ন সমবায়ের মালিকানাধীন ট্যাবলয়েড।
কো-অপ নিউজ (Co-op News)
যুক্তরাজ্য
বিশ্বের প্রাচীনতম সমবায় সংবাদপত্র (১৮৭১): সমবায় আন্দোলনের বিশ্বস্ত মুখপত্র।
এই বৈশ্বিক উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, করপোরেট পুঁজির দাসত্ব না করেও কীভাবে উচ্চমানের এবং প্রভাবশালী সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বর্তমান বাংলাদেশের মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপ সম্পূর্ণভাবে করপোরেট ও বাণিজ্যিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। এখানে এমন একটি গণমাধ্যম ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজন, যেখানে কোনো মিডিয়া হাউস কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ বা দলীয় রাজনৈতিক उद्देश्य হাসিলের জন্য জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দেবে না এবং সমাজে বৈষম্য তৈরি করবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারি কব্জা থেকে টাইমস বাংলা প্রেস ট্রাস্টের সম্পত্তি মুক্ত করে একটি স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ বা ট্রাস্টের হাতে ন্যস্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও সংবাদপত্রকে 'পাবলিক চ্যারিটি' বা 'অলাভজনক প্রতিষ্ঠান' হিসেবে নিবন্ধনের আইনি সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিক ও পাঠকদের যৌথ শেয়ার ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমবায়ভিত্তিক নতুন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা যেতে পারে।
সর্বোপরি, সৎ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উদ্যোগে একটি স্বাধীন 'মিডিয়া এনডাউমেন্ট ফান্ড' বা জাতীয় অনুদান তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যা কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই ট্রাস্ট-ভিত্তিক মিডিয়াগুলোকে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে।
২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের এই শুভক্ষণে গণমাধ্যম ব্যবস্থার সংস্কার ব্যতিরেকে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন অসম্ভব। করপোরেটদের কায়েমি স্বার্থ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রোপাগান্ডা মেশিনের হাত থেকে জনমানুষের কণ্ঠস্বরকে বাঁচাতে সামাজিকভাবে মালিকানাধীন গণমাধ্যমের পুনরুত্থান অপরিহার্য।
টাইমস বাংলা প্রেস ট্রাস্টের পুনরুজ্জীবন হতে পারে এই যাত্রার প্রথম এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং স্বাধীন গণমাধ্যম ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি, যেখানে তথ্য হবে কেবলই সত্যের বাহন, কোনো গোষ্ঠীস্বার্থের অস্ত্র নয়।
(দৈনিক দ্য নিউ নেশন পত্রিকার সফল সাবেক সম্পাদক, মোস্তফা কামাল মজুমদার বর্তমানে গ্রীণওয়াচ নামে একটি মাসিক পত্রিকা ও গ্রীণওয়াচ ঢাকা (গ্রীণওয়াচবিডিডটকম) নামে একটা নিউজ পোর্টাল সম্পাদনা করছেন)