
সংঘাত পুরোপুরি না থামলেও, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আর এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় বড় ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান। কিন্তু সেই বিষয়টি নিয়েই এবার শুরু হয়েছে নতুন এক আলোচনা। বলা হচ্ছে, পাকিস্তান নিজেকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে ইরানের সঙ্গে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি করাতে ইসলামাবাদকে ‘চাপ’ দিয়েছিল হোয়াইট হাউস।
এমনটাই দাবি করা হয়েছে সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে, যা পাকিস্তানের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এতে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদ নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ছিল না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সুবিধাজনক মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, যার মাধ্যমে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি এগিয়ে নেয়া হয়। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ছিল, তেহরান যুদ্ধবিরতি ‘ভিক্ষা’ চাইছিল।
এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল যাতে তারা ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে পারে এবং এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তেহরানের কাছে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য করে তোলা।’
পরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রচেষ্টার ফলে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরান দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
যুদ্ধবিরতির খবর সামনে আসে ট্রাম্পের এক বড় হুমকির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ইরান তার শর্ত না মানলে ‘সম্পূর্ণ সভ্যতাই ধ্বংস করে দেয়া হবে’। তবে আলোচনার সঙ্গে জড়িত সূত্রগুলোর মতে, ট্রাম্প তেলের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং ইরানি শাসকগোষ্ঠীর দৃঢ়তায় বিস্মিত হয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ২১ মার্চ ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ধ্বংস করে দেয়ার’ প্রথম হুমকির পর থেকেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির জন্য আগ্রহী ছিলেন।
কেন পাকিস্তানকে দরকার ছিল
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের মতে, ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ দুই পক্ষেরই বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাব যদি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ উপস্থাপন করে, তাহলে তেহরান তা গ্রহণের সম্ভাবনা বেশি থাকবে। বিশেষ করে যখন পাকিস্তান পুরো সংঘাতজুড়ে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছে।
ঘটনাপ্রবাহ
মঙ্গলবার ট্রাম্পের নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এর মধ্যে ট্রাম্প, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও ছিলেন।
এরপর তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে দুই সপ্তাহের প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন, যা পরে প্রকাশ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তবে পর্দার আড়ালে, শেহবাজ পোস্ট করার আগেই হোয়াইট হাউস ওই বিবৃতি দেখে অনুমোদন দিয়েছিল বলে এক প্রতিবেদনে জানায় সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
কিন্তু শেহবাজ, যিনি এই চুক্তিকে পাকিস্তানের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, তিনি তার পোস্টের শুরুতে থাকা সাবজেক্ট লাইনটি সরাতে ভুলে গিয়েছিলেন, যেখানে লেখা ছিল: ‘ড্রাফট- এক্সে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা’ (draft — Pakistan's PM message on X)।
ট্রাম্পের প্রথম আলটিমেটামের পরপরই, আসিম মুনির ও পাকিস্তানের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বার্তা আদান-প্রদান শুরু করেন। তারা ইসলামাবাদকে শান্তি সম্মেলনের স্থান হিসেবে প্রস্তাব দেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ১৫ দফা পরিকল্পনা শেয়ার করেন এবং ৪৫ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর জবাবে ইরান পাঁচ ও ১০ দফা প্রস্তাব দেয়।
দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরান ইউরেনিয়ামের মজুত সীমিত করার মতো শর্ত শিথিলভাবে মেনে নেয়ার দিকে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।
আইআরজিসির জটিলতা
আলোচনার সঙ্গে জড়িত সূত্রগুলো জানায়, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতিগতভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার বিনিময়ে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে তারা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ভেতরে বাধার মুখে পড়ে।
জানা যায়, কয়েক সপ্তাহের মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর আইআরজিসির ভেতরে যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। কিছু অংশ যুদ্ধ বন্ধের বিরোধিতা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
এদিকে, মঙ্গলবার সৌদি আরবের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রে ইরানি ড্রোন হামলা হয়, যা একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার ভাষায় ‘আলোচনা ভণ্ডুল করার শেষ চেষ্টা’ ছিল। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা পাকিস্তান এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় এবং তেহরানকে ইঙ্গিত দেয় যে এমন হামলা শান্তি প্রচেষ্টা নষ্ট করতে পারে এবং ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।
এসবের পর, বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠাতে সম্মত হন।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, এনডিটিভি