
হতাশাজনক! শেষ দিনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আগের দিনগুলোর তুলনায় হতাশাজনক। চতুর্থ দিনে দেড় সেশনে তিন উইকেট তুলে নেওয়া বাংলাদেশ শেষ দিনে এসে পুরো দিন মিলিয়ে নিতে পারলা না বাকি সাত উইকেট। কয়েক দফা পরিবর্তন হলো ম্যাচের গতিপথ। জয়ের আশাও জাগল। কিন্তু রানআউট মিস আর ক্যাচ ফেলে বাংলাদেশ যেন ম্যাচও ফেলে দিল। একমাত্র টেস্ট শেষ করল ড্র করে।
আজ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আবুধাবি টেস্টের শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ উইকেট। তবে টাইগাররা নিতে পেরেছে ৫ উইকেট। আফগানদের জন্য বিশাল লক্ষ্য তাড়া করা কঠিন ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ড্র করা। সেই লক্ষ্যে সফল হয়েছে তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ ওভার ব্যাট করে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩৪৬ রান নিয়ে পঞ্চম দিন শেষ করেছে স্বাগতিকরা।
এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৯২.৩ ওভার ব্যাট করে ৩৪৬ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে আফগানদের প্রথম ইনিংস থেমেছিল ৮৯.১ ওভারে ২৪০ রানে। ১০৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা বাংলাদেশ ১০৫.২ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ৩৭২ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছিল।
বাংলাদেশের বিপক্ষে এই ড্র আফগানিস্তানের জন্য জয়ের সমান। শেষদিনে কঠিন লক্ষ্য ছিল তাদের সামনে। ৭ উইকেটে করতে হতো ৩৪৭ রান। আফগানরা সেদিকে ছুটেনি। তারা ড্রয়ের জন্য খেলেছে। অন্তত ইসমাত আলম, সেদিকুল্লাহ অটলদের ব্যাটিং সেটাই বলে। সেই লক্ষ্যে সফলও হয়েছে তারা। বাংলাদেশকে হতাশ করে ড্র করেছে আফগানরা।
শেষ দিনে উইকেট বোলারদের জন্য সহায়ক না হলেও বাংলাদেশের সামনে যে জয়ের সুযোগ ছিল না, ঠিক তা নয়। প্রথম সেশন হতাশায় কাটানোর পর শেষ দুই সেশনে উইকেট তুলে নিয়ে আশা জাগিয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ সেশনে অটলকে ফিরিয়ে তাইজুল ইসলাম সেই আশা আরও বাড়িয়েছিলেন।
এরপর চাপে পড়ার কথা ছিল আফগানদের। কিন্তু মাঠে দেখা যায় উল্টোটা। টানা দুই বলে দুটি রান আউট মিস করে বাংলাদেশ। এরপর ক্যাচ ফেলে দেন হাসান মাহমুদ। এগুলো অন্তত সেটারই প্রমাণ। জীবন পেয়ে বাংলাদেশকে আফসোসে পুড়িয়েছেন আফগান ব্যাটাররা। মাঠ ছেড়েছে ড্র নিয়ে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ড্র করতে একটি ইতিহাসও গড়েছে আফগানিস্তান। এশিয়ায় চতুর্থ ইনিংসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ওভার ব্যাটিং করে ড্র করল তারা। ১৪২ ওভার ব্যাটিং করেছে স্বাগতিকরা।
৭ উইকেট হারে রেখে ১৩২ রান নিয়ে শেষ দিনের খেলা শুরু করেছিল আফগানিস্তান। দিনের প্রথম সেশনটা ভালো যায়নি বাংলাদেশের। দারুণ ব্যাটিংয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে স্বাগতিকরা। হাশমতুল্লাহ শাহিদিকে নিয়ে বাংলাদেশের অপেক্ষা বাড়ান সেদিকুল্লাহ অটল। তবে চোটের কারণে বেশিক্ষণ ব্যাটিং চালিয়ে যেতে পারেননি শাহিদি। মেহেদী হাসান মিরাজের করা ওভারের চতুর্থ বলে সিঙ্গেল নিতে গিয়ে ফিল্ডারের থ্রো পায়ের প্যাডে লাগলে অস্বস্তিতে পড়েন তিনি। পরে ফিজিওর সহায়তায় রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়েন শাহিদি।
এরপর অটলকে সঙ্গ দিতে নামেন ইকরাম আলীখিল। তাদের সামনেও অসহায় হয়ে পড়ছিল বাংলাদেশের বোলিং। পঞ্চম উইকেট জুটিতে ১৪৭ বল খেলে ফেলেন এই দুজন। ফলে কোনো উইকেট না হারিয়েই প্রথম সেশনের প্রায় পুরোটা কাটিয়ে দেন আফগানরা। তবে প্রথম সেশনের শেষ মুহূর্তে এক উইকেট তুলে নিয়ে মধ্যাহ্ন বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। ৬৯ বলে ৩৩ রান করা ইকরামকে ফেরান ইবাদত।
মধ্যাহ্ন বিরতি থেকে ফিরে পঞ্চম উইকেট পেতে আবারও বেশ খানিকটা সময় পেক্ষা করতে হয় বাংলাদেশকে। ব্যাটিংয়ে নেমে সময় কাটাতে থাকেন ইসমাত আলম। প্রথম ৪৫ বল থেকে কোনো রানই নেননি তিনি। ষষ্ঠ উইকেটে অটলের সঙ্গে ১২৩ বলে ৪০ রানের এই জুটিতে আবারও ম্যাচ থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
মাঝে একবার সেদিকুল্লাহ অটলকে ফেরানোর সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সেটি কাজে লাগাতে পারেননি লিটন দাস। পুরো ম্যাচে দারুণ কিপিং করা লিটন প্রথম ভুলটা করেন এবার। তাইজুল ইসলামের বলে এগিয়ে এসেছিলেন সেদিকুল্লাহ। বলটা সামান্য টার্ন করে ভেতরে ঢুকেছিল, বাড়তি বাউন্সও ছিল। স্টাম্পিংয়ের সুযোগ পেলেও বলটা হাতেই জমাতে পারেননি লিটন।
এরপর দুই উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি ফেরান মিরাজ। ৬০ বল থেকে ৪ রান করা ইসমাতকে ফেরান নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ বানিয়ে। এরপর আবারো ব্যাটিং করতে নামেন চোট নিয়ে মাঠ ছাড়া হাশমতুল্লাহ শাহিদি। ভালোই খেলছিলেন তিনি। তবে মিরাজের বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ধরা পড়েন হাসান মাহমুদের হাতে। ৬৯ বলে ৩৬ রানে শেষ হয় তার ইনিংস.
চা-বিরতি থেকে ফিরে প্রথম উইকেটের দেখা পেতে ওভার দশেক অপেক্ষা করতে হয় বাংলাদেশকে। সেই অপেক্ষা শেষ করেন তাইজুল ইসলাম। বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকা অটলকে ফেরান তিনি। তাইজুলের বলে শর্ট লেগে থাকা ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দেন অটল। রিভিউ নিয়েছিলেন। তবে রিপ্লেতে দেখা যায়, বল ব্যাটে লেগেছে। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করে ৩৩২ বল খেলে ১১১ রান করে ফেরেন তিনি।
অটল ফেরার পর চাপে পড়ার কথা ছিল আফগানদের। কিন্তু উল্টো চাপ দেখা যায় বাংলাদেশ শিবিরে। সেটার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় টানা দুই বলে দুইটি রান আউট মিস করায়। ১২২তম ওভারে দুটি রানআউট মিস করে বাংলাদেশ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যে পৌছায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সর্বশেষ উইকেট পায় ম্যাচের ১৩৭তম ওভারে মিরাজের বলে ঝাপিয়ে পড়ে শর্টে দারুণ একটি ক্যাচ নেন মুমিনুল হক। আট নম্বরে নেমে ৮৫ বল খেলে ১৯ রান নিয়ে ফিরে যান ইয়ামিন আহমাদজাই। এরপরও খেলা হয়েছে আরও পাঁচ ওভার। কিন্তু বাংলাদেশ আর কোনো হুমকিই জানাতে পারেনি। পঞ্চম দিনের পুরোটা সময় ব্যাটিং করে তাই ড্র করে মাঠ ছাড়ে আফগানরা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৯২.৩ ওভারে ৩৪৬/১০ (তামিম ৮৩, সাদমান ৬৭, মুমিনুল ৩৯, শান্ত ২৯, মুশফিক ০, লিটন ৫৩, মিরাজ ২৪, হাসান ২, তাইজুল ৯, এবাদত ০, নাঈম ৩৫*; আহমাদজাই ২০.৩-৩-৭৯-৩, সালিম ২৩-২-৮২-৪, হাশমতুল্লাহ ৩-০-২৪-০, ইসমাত ১২.৪-৫-২০-২, জিয়া-উর-রহমান ১৯-১-৭৭-০, কাইস ১৪.২-১-৬০-১)
আফগানিস্তান প্রথম ইনিংস : ৮৯.১ ওভারে ২৪০/১০ (অটল ১৭, আব্দুল মালিক ৬২, শাহিদুল্লাহ ২০, হাশমতুল্লাহ ০, ইকরাম ৩২, ইসমাত ০, কাইস ০, জিয়া-উর-রহমান ০, ইয়ামিন ০, সালিম ০, রহমত ১০৫* ; হাসান ২১-৫-৫৫-৫, এবাদত ১৫.১-৩-৫৬-৪, মিরাজ ২১-৭-৪১-১, তাইজুল ২১-৪-৪৪-০, নাঈম ১০-০-৩৭-০, মুমিনুল ১-০-৬-০
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস : ১০৫.২ ওভারে ৩৭২/৭ (ইনিংস ঘোষণা) (সাদমান ১৩, মুমিনুল ৭, তামিম ৩১, শান্ত ৮২, মুশফিক ৮১, হাসান ০, লিটন ১০২, মিরাজ ৫২*; আহমাদজাই ২০-২-৯৬-২, সালিম ১৯.২-৩-৬৯-২, ইসমাত ৩-০-৯-০, জিয়া-উর-রহমান ৩৩-৪-৮৬-২, কায়েস ১৫-০-৭০-১, আব্দুল মালিক ৩-১-৯-০, হাশমতুল্লাহ ১২-০-৩২-০)
আফগানিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস : ১৪২ ওভারে ৩৪৬/৮* (আব্দুল মালিক ২, শাহিদুল্লাহ ১৯, রহমত ৫১, শাহিদি ৩৬, ইকরাম ৩৩, ইসমাত ৪, অটল ১১১, ইয়ামিন ১৯, কায়েস ৪৯*, জিয়া-উর-রহমান ০*; হাসান ২৬-৫-৬৬-১, ইবাদত ২১-৭-৫০-৩, মিরাজ ৩৩-১০-৭৩-৩, তাইজুল ৪৮-১৭-১১২-১, নাঈম ১৪-৪-২৯-০)
ফলাফল : একমাত্র টেস্ট ড্র
ম্যাচ সেরা : লিটন দাস