News update
  • Rules on online export to global marketplaces eased     |     
  • PM reviews progress of measures to ease Dhaka traffic congestion     |     
  • Trump celebrates birthday with Iran deal, White House UFC fight     |     
  • Trump announces Iran deal, ends Hormuz blockade     |     
  • BAB welcomes reform-driven Budget FY2026–27; pledges full support     |     

কুষ্টিয়ায় 'দরবারে' হামলা চালিয়ে কথিত পীরকে হত্যা, কী হয়েছিল সেখানে?

বিবিসি নিউজ বাংলা খবর 2026-04-11, 11:40pm

rtertwerewrw-896b8a988978616326b2420afbbb10a61775929256.jpg




(সতর্কতা: এই প্রতিবেদনের কিছু অংশের বর্ণনা পাঠকের অস্বস্তির কারণ হতে পারে)

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে একটি দরবার বা আস্তানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ওই দরবারের কথিত প্রধান পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শনিবার কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' এ এই ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে।

হামলায় আরো দুইজন আহত হয়েছেন বলেও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।

তার দাবি, তিন বছর আগের একটি ভিডিও'র সূত্র ধরে কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে দুপুরের দিকে স্থানীয় একদল লোক একত্রিত হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। পরে আহত অবস্থায় তিনজনকে দৌলতপুরের থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে নেওয়া হয়।

সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে, আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মি. শামীম।

হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার কিছু ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এতে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোটা নিয়ে কয়েকশ লোক প্রথমে হামলা ও ভাঙচুর চালায় ওই দরবারে। পরে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক আহমেদ রাজু। ঘটনাস্থল থেকে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, হামলার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

দুপুর থেকে চলা এই হামলা ও ভাংচুরের পর বিকেলের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে বলে পুলিশ জানায়।

নিহত শামীম ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তিন মাস কারাগারে ছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

এই ঘটনা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক, পুলিশ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

স্থানীয়রা জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত 'শামীম জাহাঙ্গীর দরবার শরিফ'। ওই এলাকার সামসুল ইসলাম মাষ্টারের ছেলে আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নিজেকে ওই দরগার পীর দাবি করেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানান দৌলতপুরের গণমাধ্যমকর্মী আহমেদ রাজু।

শামীমের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয় বলেও জানান মি. রাজু।

"শামীমের ওই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়। পরে শনিবার দুপুর একটার দিকে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে ফিলিপনগরে অবস্থিত শামীমের দরবার শরিফ ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করেন," বলছিলেন মি. রাজু।

এদিকে, পুলিশের দাবি, যেই ভিডিওটি ঘিরে এই হামলার ঘটনাটি ঘটেছে সেই ভিডিওটি এখন থেকে অন্তত তিন বছর আগের, ২০২৩ সালের।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "২০২৩ সালের তার একটি ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওকে কেন্দ্র করে আগেও সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। তারপর ওনার এরকম কার্যক্রম চোখে পড়েনি। আজকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়"।

"সেই আগের ভিডিও দেখে স্থানীয়রা উত্তেজিত অবস্থায় আসে। যারা এই হামলা চালিয়েছে তারা সবাই স্থানীয়," বলছিলেন মি. উদ্দিন।

পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা

ওই হামলার ঘটনার বেশ কয়েকটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোটা নিয়ে শত শত মানুষ ফিলিপনগরের ওই দরবারটিতে ঢুকে হামলা চালাচ্ছে।

হামলায় স্থানীয় তরুণ, শিশু ও কিশোরদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। হামলার এক পর্যায়ে তাদের সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দিতেও দেখা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক আহমেদ রাজু বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রথমে স্থানীয়রা ওই দরবার শরিফ ঘেরাও করে। সে সময় দরবার শরিফের ভেতরেই ছিলেন মি. শামীম ও তার দুইজন অনুসারী"।

তিনি জানান, হামলাকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়ে শামীমসহ তিনজনকে আহত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই তিনজনকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় পুলিশের পাশাপাশি সেখানে আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

পুলিশ সুপার জানান, দুপুর একটা থেকে প্রায় পৌনে তিনটা পর্যন্ত সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে সেখান থেকে আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।

পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পুলিশ ঘটনার সাথে সাথে গিয়েছিল। তারা ঠেকানোরও চেষ্টা করেছে। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালেও নিয়ে গেছে পুলিশ"।

পুলিশের দাবি, তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা ছিল কথিত পীর শামীমের। তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়েছিল।

আহত অবস্থায় ওই তিনজনকে যখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় তখন বিকেল তিনটা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. তৌহিদুল হাসান তুহিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কথিত পীর শামীমকে যখন হাসপাতালে আনা হয় তখনও তিনি জীবিত ছিলেন। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি হাসপাতালে মারা যায়"।

ওই চিকিৎসক জানান, নিহত শামীমের শরীরে জখমের চিহ্ন ছিল।

মি. তুহিন বলেন, "আমাদের ধারণা তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। বাকি যে দুইজন আহত অবস্থায় ভর্তি রয়েছে তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত"।

পুলিশ ও পরিবার যা বলছে

বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ওই দরবার এলাকায় শত শত মানুষ দরবার শরিফ এলাকায় অবস্থান করছিল। সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।

তখনও সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে দরবারের জিনিসপত্র ভাংচুর চালাতে দেখেছেন স্থানীয় সাংবাদিক আহমেদ রাজু।

তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতিতেও সেখানে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

সন্ধ্যায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, সন্ধ্যায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। আমরা সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছি।

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে নানা সমালোচনাও হয়।

এখন আবারো এই ধরনের হামলার ঘটনা কেন পুলিশ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলো না সেই প্রশ্নও করা হয়েছিল পুলিশ সুপারের কাছে।

জবাবে তিনি বলেন, "সেখানে সবাই ছিল স্থানীয়। তারা প্রচণ্ড আক্রশ নিয়ে কাজটি করেছে। কোরআন নিয়ে কথাবার্তা বলেছে সে কারণে হয়তো স্থানীয়রা খুব ক্ষুব্ধ ছিল"।

তবে তিনি জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তবে নিহত শামীমের পরিবার জানিয়েছে এই ঘটনায় তারা মামলা করতে চাচ্ছে না।

নিহতের বড় ভাই গোলাম রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা বুঝতে পারতেছি না আসলে কী করবো। আমার ভাই মারা গেছে। আপাতত এতটুকুই। আমরা খুব নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না বলে মামলাও করতে চাই না"।

তবে ঠিক কী কারণে মামলায় আগ্রহী নন সেটি তিনি বলতে চাননি।

শামীমের বিরুদ্ধে ২০২১ সালেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠেছিল এবং বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ছিল বলে জানান দৌলতপুর থানার ওসি (তদন্ত) শেখ মোহাম্মদ আলী মোর্তুজা। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ওই সময় আমি এই থানায় ছিলাম না। তবে আমরা শুনেছি সে তিন মাস জেল খেটেছিল তখন"।