
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস—দুই শিবিরই নিজেদের মতো করে জয়ের অঙ্ক কষতে শুরু করেছে। বিজেপির দাবি, তারা ১২০-র বেশি আসনে এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে তৃণমূলের বক্তব্য, অন্তত ১২৫ থেকে ১৩৫ আসনে তাদেরই সুবিধাজনক অবস্থান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আত্মবিশ্বাসী দাবি যতটা বাস্তব হিসেব, ততটাই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই—প্রথম ধাক্কাতেই কে এগিয়ে, সেই বার্তা ছড়িয়ে দেয়াই এখন মূল লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৫২টিতে ভোটগ্রহণ হয়েছে, যা অর্ধেকেরও বেশি। সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮ আসন। ফলে এই দফার ফলই ক্ষমতার লড়াইয়ে বড় ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভোট চলাকালে কলকাতায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ স্পষ্ট, তার প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়েছে।’ তার মতে, ১৫২ আসনের মধ্যে ন্যূনতম ১২৫টি আসন তৃণমূল পেতে পারে, যা ১৩২-১৩৪-এও পৌঁছতে পারে।
অন্যদিকে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেন, উত্তরবঙ্গ এবারও বিজেপিকে শক্ত ভিত দেবে। প্রথম দফা থেকেই বড় লিডের আশা করছেন তারা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোট-পরবর্তী এই ধরনের দাবি অনেক সময় কর্মীদের চাঙা রাখা এবং জনমত প্রভাবিত করার কৌশলও হতে পারে। তাই দলীয় হিসেব আর বাস্তব ফলের মধ্যে পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক।
এবারের প্রথম দফায় নজর কেড়েছে বিপুল ভোটদানের হার। সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশেরও বেশি, যা কিছু ক্ষেত্রে ৯২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। মুর্শিদাবাদসহ কয়েকটি জেলায় বিক্ষিপ্ত উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবরও এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জেলায় প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখের বেশি ভোটার এই দফায় ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দফা কেবল আসনের অঙ্ক নয়—সংগঠন, বুথ ম্যানেজমেন্ট এবং ভোটার টানার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
২০২১ সালের ফলাফলে দেখা যায়, এই একই ১৫২ আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ৯২টি, বিজেপি ৫৯টি এবং একটি যায় আইএসএফের ঝুলিতে। ফলে তৃণমূল যদি এই ব্লকে বড় ধাক্কা এড়াতে পারে, তবে ক্ষমতা ধরে রাখার পথে তারা এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে বিজেপি ব্যবধান কমাতে পারলে বা এগিয়ে গেলে তা হবে বড় রাজনৈতিক বার্তা।
এই দফায় উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসন রয়েছে যেখানে ২০২১ সালে বিজেপি জিতেছিল ৩০টি। ফলে এই অঞ্চল এখনও বিজেপির শক্ত ঘাঁটি বলেই ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ ও পশ্চিম-মধ্য বঙ্গের কিছু অংশে তৃণমূলের সংগঠনগত ভিত্তি মজবুত।
বিশেষ নজর রয়েছে মুর্শিদাবাদ, ব্যাঙ্কুরা, পুরুলিয়া এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ৫৯টি আসনের দিকে। এই আসনগুলোর ফলই প্রথম দফার সামগ্রিক চিত্র নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মুর্শিদাবাদ ও মালদা এই দুই জেলায় সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২১ সালে এই জেলাগুলো তৃণমূলকে বড় সুবিধা দিলেও, এবার সেই চিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কংগ্রেস, বাম এবং ছোট মুসলিম দলগুলোর সক্রিয়তা তৃণমূলের র চাপ তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে হুমায়ুন কবিরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাবরি মসজিদের আদলে মসজিদ নির্মাণের ইস্যুতে তিনি আলোচনায় এসেছেন। যদিও একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে বিতর্কে পড়েছেন তিনি এবং সেটিকে ভুয়ো বলে দাবি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটে সামান্য ভাঙন হলেও তার প্রভাব পড়তে পারে বহু আসনে। ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ে কয়েক হাজার ভোটই ফল নির্ধারণ করতে পারে।
এছাড়া এসআইআর-এ প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
সব মিলিয়ে, প্রথম দফা শুধুই শুরু নয়এটাই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের গতি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই দফা সরকার গঠনের চূড়ান্ত রায় নয়, তবে দিকনির্দেশ অবশ্যই দেবে। তবে এখনও ১৪২টি আসনে ভোট বাকি থাকায় চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে পরবর্তী দফাগুলোর উপরও। সময়।