
Zainul Abedin
জয়নাল আবেদিন
বাংলাদেশের একান্ত প্রতিবেশি ভারতের পশ্চিম বাংলায় আগামী ২৩ এপ্রিল থেকে ২৬এপ্রিল পর্যন্ত পশ্চিম বাংলার বিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ তথা মুসলিমবিরোধী প্রচরণা একটা বড় ফ্যাক্টর। কলিকাতার জাতীয়তাবাদী চেতনার পত্রিকা সংবাদ সোচ্চার সম্মাদক সুভাশীষ ঘোষ জানিয়েছেন এই নির্বাচনে মধ্যমপন্থী তৃণমুল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতা হচ্ছে । মমতা একাধারে ২০১১ সন থেকে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিজেপি পশ্চিম বাংলাকে বিজেপি’র শাসনাধীনে নেয়া খুবই জরুরী, যা বাংলাদেশের ওপর চাপে রাখার জন্য খুবই জরুরী । বিজেপি মনে করতো শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখা মানে বাংলাদেশ ভারতের দখলে থাকা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ আর কখনোই ভারতের হাতছাড়া হবে না। তাই ভারতের সবদল তথা গোয়েন্দা সংস্থা ও নীতি-নির্ধারকরা শেখ হাসিনার কর্তত্ববাদী শাসনকে এক্যবদ্ধভাবে সমর্থন যুগিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ ভারতের ছায়ারাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেখানে ভারতকে এক পয়সাও খরচ করতে হতো না, কিন্তু বাংলাদেশকে নিজ ভূখন্ডের মতো একচ্ছত্র ভোগ করার অধিকার পায়। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সব দল এবং নীতি-নির্ধারকমন্ডলী, বিশেষত সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশ হাতছাড়া হবার মনস্তাত্রিক রোগে ভুগছে।
বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন এমন মহল মনে করেন বাংলাদেশকে সরাসরি দখল না হোক কমপক্ষে ভূটানের পর্যায়ে না আনা পর্যন্ত ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের স্বস্তি¡ নেই। এই কারণে এই নির্বাচন বিজেপি তথা ভারতের জন্য খুবই বিজয়ী হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শুভাশীষ ঘোষ জানান মমতার মতো স্বাধীনচেতা রাজনীতিককে বিজয়ী করতে পশ্চিম বাংলার মুসলিম এবং বঞ্চিত সচেতন হিন্দুরা বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তাই ঐতিহাসিক যুগসূত্র এবং ভাষাগত অভিন্নতা পশ্চিম বাংলার বঞ্চিত জণগনের মধ্যে মূল ভারতবিরোধী চেতনা গড়ে ওঠার আগেই মমতার মতো নেতৃত্বকে থামিয়ে পশ্চিম বাংলাকে হিন্দি বেল্টে বন্দী করা বাঞ্চনীয় । তবে কিছু বাস্তবতাও পশ্চিম বাংলার সচেতন মহলকে ক্ষুব্ধ না করে পারে না। এই ব্যাপারে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা তথা সেনাবাহিনী সেনবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে এমন আশংকা তৈরি হয়েছে যে ১৯৪৭ ভারত বিভক্তির সময় সব দিক থেকে সর্বাধিক সমৃদ্ধ পশ্চিম বাংলা এখন পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেছে। শুভাশীষ ঘোষ জানান বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অধোগতি পশ্চিম বাংলাকে প্রান্তিক রাজ্যে পরিণত করেছে। পশ্চিম বাংলার বেকার যুব সমাজ এখন জীবিকার জন্য দাক্ষিণাত্যে কিংবা মারাঠা-গুজরাটের দিকে দৌড়ে যেখানে তাদেরকে বহিরাগত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুভাশীস মনে করেন ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা পশ্চিম বাংলার সমস্যার প্রতি একেবারেই উদাসিন, যা আমাদেরকে যারপরনাই ক্ষুদ্ধ করে। সামনের দিনগুলো কেমন হবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কীভাবে গড়ে ঊঠবে তা নিয়ে আমরা রীতিমত উদ্বিগ্ন ও শংকিত।
তিনি জানান এমনি একটি মনস্তাত্বিক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে এই নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষও মনে করেন নির্বাচন কমিশন এমনকি সুপ্রিমকোর্ট মোদি সরকারের পাপ ও পা ধোয়ার দায়িত্বে নেমেছে। নির্বাচনের ফলালফলকে নিজেদের মতো করিয়ে নেয়ার এমন নোঙরামি এর আগে আর হয় নি। এতে ভারতীয় গণতন্ত্র যে নিছক ভাওতা তা আরেকবার স্পষ্টভাবে প্রমানিত হবে ৯১ লাখ।
উল্লেখ্য, ভারতীয় নির্বাচনী ফলাফল সব সময়ই ধুম্প্রজালে আচ্ছন্ন। বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই ভোট শেষ হবার পরেই প্রত্যেক কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ভারতে এক অদ্ভূত নিয়ম চালু হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল ভোট গ্রহণ শেষে সাথে সাথে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয় না। ভোট শেষে ভোটের বাক্স নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বেশ ক’দিন পর ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে নির্বাচন ক্ষমতাসীন সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন ফলাফল পরিবর্তনের একটি অনন্য সুযোগ পায়। পূর্ববর্তী কংগ্রেস কিংবা বর্তমান বিজেপি সরকার যে এই সুযোগের অপব্যবহার করেনি কিংবা করবে না তা নিশ্চিত বলা যায় না। এটা একটা উদ্ভট পদ্ধতি যা স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
পশ্চিম বাংলার আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক তা বাংলাদেশের ওপর একটি পরিকল্পিত অশুভ ঝড় আসতে পারে । সেই আলামত যে নির্বাচনের আগেই শুরু হয়েছে, সে ব্যাপারে সচতন মহল একমত। এই মহল মনে করেন ভারত তার দেশের স্থায়ী বাসিন্দাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পাঁয়তারা করছে । শুভাশীষ ঘোষ সরকারী তথ্য-উপাত্য উল্লেখ করে জানান, ইতোমধ্যেই ২৭,১৬,৩৯৩ জন পশ্চিম বাংলাবাসী ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার হারিয়েছেন। এদেরকে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম বাংলায় আসা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী কিংবা রোহিঙ্গা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে পশ্চিম বাংলার মুসলিম প্রধান এলাকা মুর্শিদাবাদ, মালদাহ, পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি. কোচবিহারসহ মুসলিম প্রধান অঞ্চলের অজানাসংখ্যক মুসলিম ভোটার ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাদেরকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী কিংবা রোহিঙ্গা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যদিও এরা বংশাক্রমিকভাবে পশ্চিম বাংলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং ১৯৪৭ সনে ভারত বিভক্তির সময়ও এদের পূর্ব পুরুষরা ১৯৪৭ সনে পূর্ব পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতেই থেকে যান এবং জায়গাজমির দলিলপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখানোর পরেও এদের ভোটার তালিকাভুক্ত করা হয় নি।
এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে খোদ মমতা ব্যানার্জী সুপ্রিমকোর্টে দারস্ত হয়েও তেমন সুবিধা করতে পারেন নি। বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা, এমনকি নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই হিন্দত্ববাদী বিজেপি’র দখলে চলে গেছে, যে পন্থায় চাকরিতে দ্রুত পদোন্œতি হবে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে । ফলে এখন এই দুটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মূল কাজ তৃণমূল তথা মমতা ব্যানার্জীকে আসন্ন নির্বাচনে পরাজিত করা। এখানে নীতি-নৈতিকতা এবং নিরপক্ষেতার স্থান নেই। অন্যদিকে ভারত বহুদলীয় গণতন্ত্রের মুখোশ পরে একদলীয় শাসনের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। আসামে শর্মা সরকার ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে যে সেখান থেকে প্রতিদিন একহাজার করে ভারতীঢ বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়া দেয়া হবে।
তথাপি মুসলিম তথা বাংলাদেশবিরোধী একটা পরিকল্পিত চক্রান্ত। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিপকল্পিত চক্রান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগনকে শক্তভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক সরকারের পিছনে দাঁড়াতে হবে। আমাদের বিপুল সমর্থনে নির্বাচিত এই সরকারই আমাদের ভরসা। বিভিন্œ অজুহাতে আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর যে আলামত শুরু হয়েছে তা দেশ ও জনগণের জন্য আত্মঘাতি হতে পারে। আসুন আমরা সবাই এই চক্রান্ত প্রতিহত করি। *
(লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও গবেষক)
মিরপুর, ঢাকা, ১০, এপ্রিল, ২০২৬