News update
  • Ambassadors meet as West Bank tensions rise, Gaza plan stalls     |     
  • VAT Returns to Be Filed Every Tax Period Again     |     
  • No journalist to be victimised under Cyber Security law: Salahuddin     |     
  • Court Denies Bail to 27 Detained From Jasad Office     |     
  • Bangladesh Plans Major River, Canal Restoration Drive     |     

বন্দর হস্তান্তরে ‘সক্ষমতা নেই’ যুক্তি ৫৪ বছরের প্রতারণা : আনু মুহাম্মদ

গ্রীণওয়াচ ডেস্ক সংগঠন সংবাদ 2026-09-08, 9:10pm

d791056f-292c-4f56-ae75-d5f43914b5e8-a6ec6f3710fb823050e7b64109966bd71788880226.jpg




চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের নামে আওয়ামী আমলের সেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম উঠে আসা এই সরকারের জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান মুখে বললেও মূলত বন্দরের আধিপত্য দখলে নিয়েছে সেই পুরনো শকুন।

আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি (এমসিআরএস) আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা নেই’— এই কথাটি দিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে গত ৫৪ বছর ধরে প্রতারণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান; সেই প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়া বন্দর তুলে দেওয়ার মতো নির্বুদ্ধিতা দেখালে রাষ্ট্র হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

এ সময় আনু মুহাম্মদ রূপপুর ও মাতারবাড়ীর উদাহরণ টেনে বলেন, অতি উচ্চাভিলাষী সেসব প্রকল্প নিয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।

গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস। প্রবন্ধে বলা হয়, আলোচনাটি ‘দেশি না বিদেশি’ প্রশ্নে আটকে থাকলে মূল হিসাবটিই আড়ালে পড়ে যায়। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত—মোট সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় ১৪টি কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি যুক্ত হয়েছে এবং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) সচল রয়েছে। দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি হ্যান্ডলিং করেছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ—জার্মান পরামর্শকের নিরূপিত ১১ লাখ টিইইউ সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি; ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ।

প্রবন্ধে প্রস্তাবিত কাঠামোর তিনটি পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রথমত, দায়িত্বের ধরন—শুরুতে ‘অপারেটর’, পরে ‘কনসেশনিয়ার’; ফলে মাশুলের অর্থ আর সরাসরি বন্দরের হিসাবে জমা হবে না। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট পার-টিইইউ রাজস্বের বদলে স্তরভিত্তিক রয়্যালটি, যেখানে ‘গড় আয়’ কত দেখানো হবে তার ওপরই বন্দরের প্রাপ্তির হার নির্ভর করে। তৃতীয়ত, মেয়াদ—১৫ বছরের আর্থিক মডেলে হিসাব প্রস্তুত হলেও দাবি এখন ৩০ বছরের।

ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রতি কনটেইনারে বন্দরের নিট প্রাপ্তি ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার থেকে নেমে ১৭ দশমিক ১৮ ডলারে দাঁড়াতে পারে—প্রায় ৭৪ শতাংশ কম (একই ১২০ ডলার আয়ের ভিত্তিতে)। প্রতি কনটেইনারে ৪৮ দশমিক শূন্য ৭ ডলার পার্থক্য মানে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা; ১৫ বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি এবং ৩০ বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। তুলনায় প্রস্তাবিত বিদেশি বিনিয়োগ ২০৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা)—বিনিয়োগের খাত অনির্দিষ্ট। দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিটি রাজস্ব-ধাপে ৫ ডলার বেশি এবং অগ্রিম ফি ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রস্তাব করেছে—প্রতি টিইইউতে ৯৮ দশমিক ৫০ ডলার, যা বিদেশি প্রস্তাবের সর্বোচ্চ সীমার (৯৭ দশমিক ৫০ ডলার) চেয়েও বেশি। এ ছাড়া দর-কষাকষিতে ন্যূনতম কনসেশন ফি ৯৯ দশমিক ৫৪ ডলার থেকে ৯৪ দশমিক ৯৬ ডলারে নামানো হয়েছে—শুধু এই এক সমন্বয়েই বছরে প্রায় ৬৩ লাখ ডলার ছাড়। আদালত কেবল প্রক্রিয়ার বৈধতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন; চুক্তির শর্তাবলি কখনো পরীক্ষা করেননি—কারণ শর্তাবলি আজও প্রকাশিত নয়।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, আধুনিক টার্মিনালের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ক্রেন নয়, তথ্য—কার্গো ম্যানিফেস্ট, শিপার ও কনসাইনি তথ্য, রপ্তানি প্রবাহ ও বার্থিং সূচি যার নিয়ন্ত্রণে, বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের পূর্ণ চিত্র কার্যত তার হাতে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে আলোচ্য বৈশ্বিক অপারেটরের অস্ট্রেলিয়া কার্যক্রমে সাইবার হামলায় চারটি বন্দরের কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩০ হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে পড়ে।

একই অপারেটর এনসিটি ও সিসিটি—দুটি প্রধান টার্মিনাল পরিচালনা করলে মাশুল ও বার্থিং অগ্রাধিকারে ব্যবহারকারীর কোনো বিকল্প থাকে না বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

এমসিআরএসের সাত দফা প্রস্তাব

ধারণাপত্রে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দফাগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নয়—দেশি হোক বা বিদেশি, যেকোনো অপারেটরের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

এক. প্রক্রিয়া : কৌশলগত জাতীয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি হস্তান্তর কেবল উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে; অযাচিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরাসরি আলোচনা নয়।

দুই. বাধ্যতামূলক যৌথ উদ্যোগ : সব কৌশলগত অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগে দেশীয় কোম্পানির ন্যূনতম ৫১ শতাংশ মালিকানা, বিদেশি অংশীদারের সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ; প্রযুক্তি হস্তান্তর বাধ্যতামূলক।

তিন. মেয়াদ ও পরিধি : মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর এবং তা প্রকৃত বিনিয়োগ ও পরিশোধকালের সঙ্গে সংযুক্ত; একই অপারেটর একই বন্দরে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করতে পারবে না।

চার. মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ : ৫১/৪৯ কাঠামো কাগজে-কলমে নয়, কার্যত নিশ্চিত করা—শেয়ার, লভ্যাংশ-অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকার তিন স্তরেই দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা; প্রকৃত সুবিধাভোগী ঘোষণা বাধ্যতামূলক।

পাঁচ. তথ্য ও কৌশলগত সুরক্ষা : টিওএস ও সমস্ত পরিচালন তথ্যের মালিকানা রাষ্ট্রের; তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ; স্বাধীন সাইবার-নিরাপত্তা নিরীক্ষা; সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ ও নজরদারি অবকাঠামোর স্পষ্ট সীমা।

ছয়. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি : স্বাক্ষরের আগে চুক্তির খসড়া শর্তাবলি প্রকাশ ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন; স্থানীয় এজেন্ট, অংশীদার ও প্রকৃত সুবিধাভোগীর তালিকা প্রকাশ।

সাত. শ্রমিক ও দেশীয় শিল্প : বিদ্যমান জনবলের চাকরি ও সেবাশর্ত সুরক্ষা; দেশীয় বার্থ অপারেটর ও সেবাদাতাদের সাবকন্ট্রাক্টরে পরিণত না করে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা; দেশীয় পতাকাবাহী ও ফিডার জাহাজের বার্থিং-বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির শীর্ষ নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দিলে শ্রমিকদের আন্দোলন সামাল দেওয়া যাবে না। কারণ শ্রমিকরা বিশ্বাস করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে লিজ দেওয়া মানেই বন্দরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সব ধরনের অধিকার হরণ করা।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির (এমসিআরএস) নির্বাহী পরিচালক বাতেন বিপ্লব। আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস, ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি সায়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট দিলীপ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা রিতু ও নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।

বক্তারা বলেন, প্রশ্নটি ‘দেশি না বিদেশি’ নয়—প্রশ্ন হলো কোন শর্তে, কত বছরের জন্য, কতটা স্বচ্ছতায় এবং শেষ বিচারে লাভবান হবে কে। একটি ভুল দরপত্র বাতিল করা যায়, একটি ভুল বিনিয়োগ পুনর্গঠন করা যায়; কিন্তু ৩০ বছরের একটি আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সালিসি আদালতে বছরের পর বছর লড়তে হয়। তাই তাড়াহুড়ো নয়—প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে, স্বাক্ষর পরে।