News update
  • Global food prices rise amid weather strain, trade disruptions     |     
  • Dhaka Seeks Ganges Treaty With Guarantee on Water Share     |     
  • Navi Pillay Wins 2026 Nobel Peace Prize     |     
  • Bangladesh Steps Up Anti-Trafficking Efforts, US Says     |     
  • Cheap reading glasses remain key conduit to better quality of life     |     

রূঢ় বাস্তবতার মুখে বিস্মৃতির আড়ালে মুজিব পরদেশী

গ্রীণওয়াচ ডেস্ক সেলিব্রিটি 2026-08-07, 9:45am

mujib_prdeshii_1-df58d6185f8935ef2d99b88573aca6f91786074386.jpg




‘আমি বন্দি কারগারে, আছি গো মা বিপদে-বাইরের আলো চোখে পড়ে না, আমি বন্দি কারাগারে’ গানের কথাগুলোর মনে আছে? আশির দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি এটি। আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রায় প্রতিটি মানুষই গানটি একবার হলেও শুনেছেন।

হাসান মতিউর রহমানের লেখা বিখ্যাত এই গানের শিল্পী মুজিবুর রহমান মোল্লা, যাকে সবাই মুজিব পরদেশী নামে চেনেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী মুজিব পরদেশীর গান বা তার সঙ্গে বর্তমান প্রজন্ম পরিচিত না হলেও এমন এক সময় ছিল যখন বাংলাদেশে এমন কোনো শ্রোতা পাওয়া যায়নি যিনি তার গানের প্রথম অ্যালবামটি শোনেননি।

এক সময় দেশের প্রতিটি শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের সবখানে মুজিব পরদেশীর ‘আমি বন্দি কারাগারে’ বাজতে থাকতো। সে সময় মিউজিক ভিডিওর তেমন প্রচলন ছিল না, তবে কেবল অডিও ক্যাসেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না আমি বন্দি কারাগারে’। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ ছবিতে ‘আমি বন্দি কারাগারে’ গানটি এমনই ‘হিট’ করেছিল যে ছবিটি হয়ে গেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের রেকর্ড গড়া সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি। এভাবেই মুজিব পরদেশী হয়ে গেলেন ফোক গানে বাংলাদেশের শ্রোতাদের খুব জনপ্রিয় একটি নাম।

তবে সময়ের জনপ্রিয় এই শিল্পী বর্তমানে রয়েছেন কারাগারে। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় ওয়ারেন্ট ছিল। গত সোমবার (৩ আগস্ট) তাকে ঢাকার কেরাণীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরবর্তীতে উত্তরা পশ্চিম থানায় হস্তান্তর করা হলে সেখান থেকে গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সাজাপ্রাপ্ত মুজিব পরদেশীকে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, ‘একটি পুরোনো মামলায় মুজিব পরদেশীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ছিল, গত সোমবার কেরাণীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে আমাদের থানায় নিয়ে আসি। সেখান থেকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’

ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালে, মুজিব পরদেশীর ১০ লাখ টাকার একটি চেক ডিজঅনারের অভিযোগ এনে ইদ্রিস আলী বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি মাগুরার আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার বিচার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ মাগুরার দ্বিতীয় যুগ্ম দায়রা জজ মুহাম্মদ আনোয়ার ছাদাত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মুজিব পরদেশীকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি চেকের সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

এরপর থেকেই তিনি পালাতক অবস্থায় ছিলন। এতে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর গত সোমবার গ্রেপ্তার হন এই প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।

তার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন জানান, অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করার পর হেফাজতে রাখার জন্য পুলিশ আবেদন করেছিল। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

শুনানির সময় পরদেশীর পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত হননি। তবে, অভিযোগকারীর আইনজীবী শফিকুল ইসলাম জামিনের বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি মামলাটি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও পলাতক রয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি আদালতকে জামিনের আবেদনটি খারিজ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পরদেশীর মুক্তি অভিযোগকারীর স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে।

এবারই প্রথম নয়, এর আগেও ‘আমি বন্দি কারগারে’ গানের প্রখ্যাত এই শিল্পী কারাগারে যান। মুজিব পরদেশী যখন তার প্রথম অ্যালবাম দিয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখনই ঘটে ছন্দপতন। একটি শো করতে লন্ডনে যান তিনি। সেখানে গিয়ে আয়োজকদের পরামর্শে রয়ে গেলেন বেশ কিছুদিন। ৪ মাসের ভিজিট ভিসা শেষ হওয়ার পরেও আরও কিছুদিন রয়ে যান এবং একসময় দেশে ফিরে আসেন।

লন্ডনে থাকাবস্থায় আদম পাচারের মাফিয়া চক্রের খপ্পরে পড়েন মুজিব পরদেশী। দেশে ফিরে এসে লন্ডনে লোক নিবেন বলে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে নুরুল ইসলাম নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে তা দেন, যিনি ছিলেন বাংলাদেশে ওই মাফিয়া চক্রের সদস্য। মানুষের কাছ থেকে নেওয়া সেসব টাকা নিয়ে নুরুল ইসলাম আত্মগোপন করলে মুজিব পরদেশীর ওপর পাওনাদাররা টাকা ফেরত চেয়ে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু মুজিব পরদেশী সব টাকা তো না বুঝেই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যার ফলে পাওনাদাররা টাকা না পেয়ে মুজিব পরদেশীর নামে মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান তিনি। বেশ কিছু দিন কারাগারে থেকে নিজের গাওয়া বিখ্যাত গানের কথাগুলো উপলদ্ধি করতে হয় তাকে। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

যদিও জামিনে বের হওয়ার পর থেকে আর কখনো মামলায় হাজিরা দেননি মুজিব পরদেশী। সেই থেকে পালিয়ে থাকতেন তিনি। এভাবেই একজন দুর্দান্ত শিল্পী হারিয়ে যেতে থাকেন ধীরে ধীরে।

২০১৬ সালে প্রায় দুই দশক পর নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তাকে ফের নিয়ে আসেন সঙ্গীত জগতে। ফারুকীর করা একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনচিত্রের জন্য গান করেন তিনি। এরপর ২০১৭ সালের আগস্টের দিকে নীহার আহমেদের লেখা ‘প্রেমের কাঁটা’ শিরোনামে একটি গান করেন মুজিব পরদেশী। তারপর থেকে তাকে আর সেভাবে দেখা যায়নি নতুন কোনো গান নিয়ে আসতে।

মুজিব পরদেশীর শৈশব কেটেছে পাকিস্তানে। দেশটির করাচিতে ব্যবসা করতেন তার বাবা ইউসুফ আলী মোল্লা। সেখানেই তার জন্ম, তিন ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন মুজিবুর রহমান মোল্লা। করাচিতে থাকতেই সঙ্গীত অঙ্গনে তার হাতেখড়ি হয়। করাচির ওস্তাদ আশিক আলীর কাছে প্রথম তবলা বাজানো শেখেন মুজিব পরদেশী। এরপর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন ওস্তাদ গোলাম হায়দার আলী খানের কাছে। ১১ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালে ঢাকায় চলে আসেন। বাংলাদেশে এসে ওস্তাদ ফজলুল হক আর ওস্তাদ আমানউল্লাহ খানের কাছে দীর্ঘদিন তালিম নিয়েছেন।

প্রখ্যাত শিল্পী মুজিবুর রহমান মোল্লা থেকে মুজিব পরদেশী হয়ে উঠেন ১৯৮৬ সালে। সে সময় গীতিকার হাসান মতিউর রহমান একজন শিল্পী খুঁজছিলেন, যিনি পঙ্কজ উদাসের মতো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গজল গাইতে পারেন। তখন মুজিব পরদেশী শৌখিন শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে গান করতেন।

হাসান মতিউর রহমান মুজিবুরকে ক্যাসেট বের করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে মুজিবুর রহমান মোল্লা একটি অডিও ক্যাসেট বের করতে আসেন। তখন হাসান মতিউর রহমান মুজিবুর রহমান মোল্লা নামটির বদলে রাখলেন মুজিব, সাথে যোগ করলেন ‘পরদেশী’ শব্দটা। এভাবে হাসান মতিউর রহমানের হাতে জন্ম নেয় একজন নতুন শিল্পী ‘মুজিব পরদেশী’।

১৯৮৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাত্র পৌনে ২ ঘণ্টায় ১১টা গান রেকর্ডও করে ফেললেন; যা পরে হয়ে যায় এক ইতিহাস। অ্যালবামটি বিক্রি হয়েছিল ৬০ লাখ কপি (মূল কোম্পানির)। আর নকল করে আরও প্রায় ২৫-৩০ লাখ কপি। যেটি অডিও শিল্পের সর্বাধিক বিক্রীত ক্যাসেটের রেকর্ড।

মুজিব পরদেশীর আরও কয়েকটি বিখ্যাত গান হলো, ‘কলমে নাই কালি’, ‘তোমায় আমি হলেম অচেনা’, ‘আমার সাদা দিলে কাদা লাগাই গেলি রে বন্ধুয়া’, ‘আমি যার লাগি হইলাম অনুরাগী গো প্রাণসজনী’, ‘আমার জনম গেলো কাঁদিতে’, ‘আমারে নি পড়ে তোমার মনে’ এবং ‘আমার সোনা বন্ধু রে’।