
লিভার প্রতিস্থাপন কর্মসূচি জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ। আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান হারের দ্বিগুণ।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফ উদ্দীন বাসসকে বলেন, ‘লিভার প্রতিস্থাপন এখন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে আমরা প্রতি মাসে দুটি করে লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করছি।’
তিনি জানান, আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে একটি করে লিভার প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের নেতৃত্বে ১৯টি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি (বহু-বিভাগীয়) দল এই অস্ত্রোপচারগুলো পরিচালনা করে।
বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান সি দাস জানান, লিভার সিরোসিসের শেষ পর্যায়, লিভার ক্যান্সার এবং লিভার বিকল (অ্যাকিউট লিভার ফেইলিওর) এই তিনটি প্রধান শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে রোগীরা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের যাত্রা
২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১৩টি অঙ্গ প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে আটটি বিএমইউতে, তিনটি বারডেমে এবং দুটি ল্যাবএইড হাসপাতালে করা হয়েছে।
২০১০ সালের ৩ জুন বারডেম হাসপাতালে দেশের প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। এরপর ২০১১ সালের ৬ আগস্ট এবং ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সেখানে আরও দুটি লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।
এছাড়া, ২০১১ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে ল্যাবএইড হাসপাতালে দুটি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়, যা পরিচালনা করেছিল বিএমইউ-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল।
বিএমইউ ২০১৯ সালে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন কর্মসূচি শুরু করে। তখন থেকে তারা মোট আটটি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে ছয়টি ২০২৫ ও ২০২৬ সালের নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় করা হয়েছে।
সর্বশেষ ছয়টি প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্পন্ন হয়েছে। এতে ভারতের হায়দ্রাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হাসপাতালের একটি বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর বিএমইউ-তে আরও দুটি লিভার প্রতিস্থাপন করার কথা রয়েছে।
বোনের লিভার বোনকে, বাবার লিভার মেয়েকে দান
বাগেরহাটের শরণখোলার দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ইসমাত ইতি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। পরবর্তীতে ৪ জুলাই বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে তিনি বিনামূল্যে লিভার প্রতিস্থাপন করান। তার বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা নিজের লিভারের একটি অংশ তাকে দান করেন।
স্নাতক ডিগ্রিধারী আয়েশা জানান, তারা দুজনেই এখন সুস্থ আছেন। বোনরা তিন মাস ধরে বিএমইউ নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর তারা গতকাল সোমবার বাড়ি ফিরে যান।
এদিকে, নারায়ণঞ্জের বন্দর এলাকার ২৩ বছর বয়সী সুমাইয়া কবির তার বাবা হাজি কবির হোসেনের (৬২) শরীরে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করেন। কারণ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার বাবার লিভার সিরোসিস ধরা পড়েছিল।
এই অস্ত্রোপচারটিও চলতি বছরের ৩ জুলাই বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে সম্পন্ন হয়।
সুমাইয়া জানান, তিনি ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং তার বাবাও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে, তারা দুজনেই এখনো নিয়মিত ফলো-আপ চিকিৎসার অধীনে রয়েছেন।
উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল
বিএমইউর প্রতিস্থাপন পরিষেবায় সর্বশেষ ছয়জন গ্রহীতার মধ্যে পাঁচজন বেঁচে আছেন, তবে একজন সংক্রমণের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। এর আগের চারজন রোগীও সফল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বেঁচে আছেন।
ডা. সাইফ জানান, বিশ্বমানের বিশেষায়িত কেন্দ্রগুলোতে লিভার প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বিএমইউ-তে এই সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ, যা তাদের এই কর্মসূচি সম্প্রসারণে উৎসাহিত করেছে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতিস্থাপন গ্রহণকারীদের আজীবন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার (ফলো-আপ) প্রয়োজন হয় এবং তাদের বিশেষ ওষুধ সেবন করতে হয়। প্রতিস্থাপিত অঙ্গটিকে শরীর যেন প্রত্যাখ্যান না করে (অর্গান রিজেকশন), তা রোধ করার জন্য এই ওষুধগুলো অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসক জানান, শুরুতে ওষুধের পেছনে মাসিক খরচ ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা হতে পারে, তবে সংকটপূর্ণ সময় পার হয়ে গেলে এই খরচ কমে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে।
দেশে চিকিৎসা সুবিধা বাঁচাবে বিপুল অর্থ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে হেপাটোলজিস্টরা জানান, বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ লিভারজনিত রোগে ভুগছেন। এর ফলে প্রতি বছর ২২ থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরোসিস ও লিভার ক্যানসার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর এক হাজারের বেশি লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে।
তারা জানান, প্রতিবেশী কোনো দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের প্যাকেজ খরচ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। তবে জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে থাকার প্রয়োজন হলে এই খরচ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে এই খরচ ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে, আর পশ্চিমা দেশগুলোতে তা আরও অনেক বেশি। তাই বিএমইউতে লিভার প্রতিস্থাপনের সুবিধা থাকলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
অধ্যাপক বিধান জানান, বিএমইউ-এর প্রাথমিক কর্মসূচিতে ১০টি অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি তহবিল থেকে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—অর্থাৎ প্রতি অস্ত্রোপচারে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার পর্যায়ে এই ব্যয় হয়েছিল।
কর্মসূচিটি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে প্রকৃত ব্যয় আরও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন যে, বিএমইউতে সরকারি ভর্তুকি সত্ত্বেও একটি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার খরচ শেষ পর্যন্ত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হতে পারে; অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে একই প্রক্রিয়ার খরচ করপোরেট রেট অনুযায়ী প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
দাতার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব
বিএমইউতে বর্তমানে জীবিত দাতার শরীর থেকে লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন (লিভিং-ডোনার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন) করা হয়। তবে বাংলাদেশে মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন এখনও শুরু হয়নি। তবে, এ ব্যাপারে সম্প্রতি একটি আইন পাশ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. সাইফ।
বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়রা উপযুক্ত গ্রহীতার জন্য তাদের লিভারের একটি অংশ দান করতে পারেন। এছাড়া, সাম্প্রতিক এক আইনি সংশোধনী অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের সাপেক্ষে ‘আবেগী দাতা’ যারা আত্মীয় নন কিন্তু গ্রহীতার সঙ্গে গভীর আবেগীয় সম্পর্ক রয়েছে— তারাও লিভার দান করতে পারেন।
ডা. সাইফ জানান, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হয়, যাতে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য না থাকে তা নিশ্চিত করা যায়।
তিনি বলেন, ‘দাতা নির্বাচনের আগে আমরা বিস্তারিত চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। একজন সুস্থ ব্যক্তির শরীর থেকে লিভারের অংশ নেওয়ার সময় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’
সাধারণত ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দাতা নির্বাচন করা হয়। তবে বিএমইউ সম্ভব হলে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী দাতাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো গুরুতর ও অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
বিএমইউর কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনো দাতার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি
একটি লিভার প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। দাতাকে এক থেকে তিন দিন আইসিইউতে থাকতে হতে পারে এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন।
গ্রহীতাকে সাধারণত প্রায় সাত দিন আইসিইউতে থাকতে হয় এবং তাকে দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। জীবিত দাতার ক্ষেত্রে, তার লিভারের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশ অপসারণ করা যেতে পারে। অবশিষ্ট ৩৫-৪০ শতাংশ লিভার সময়ের সাথে সাথে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে সক্ষম।