সামরিক বাহিনীর পুতুল সু চি সরকার অপমানিত

সামরিক বাহিনীর পুতুল সু চি সরকার অপমানিত

0

ব্রাসেলসের ইউরো-বার্মা অফিসের (ইউরোপিয়ান অফিস ফর দি ডেভেলপমেন্ট অব ডেমোক্র্যাসি ইন মিয়ানমার) পরিচালক ইয়ার্ন ইয়ুনগবি সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু এবং মিয়ানমারের নেত্রী সু চি নিয়ে ঢাকার একটি ইংরেজী সাথে কথা বলেছেন। তিনি রাখাইনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর আলোকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ওপর আলোকপাত করেছেন।বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট সাও শ তাইকের ছোট ছেলে ইয়ার্ন। সাও ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত বার্মার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ১৯৬২ সালে কারাগারে মারা যান। ১৯৪৭ সালের পাংলাং এগ্রিমেন্টের স্থপতি ছিলেন সাও শ তাইক জেনারেল আং সান। ওই চুক্তির বলেই আধুনিক বার্মা জাতির উদ্ভব ঘটে।
ইয়ার্ন ১৫ বছর বয়স থেকে কানাডায় নির্বাসিত। সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৬২ সালের ২ মার্চ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিয়ানমার ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
তিনি প্রবাসী বার্মা সরকার ন্যাশনাল কোয়ালিশন গভার্নমেন্ট অব দি ইউনিয়ন অব বার্মার (এনসিজিইউবি) প্রধানমন্ত্রী ড. সিন উইনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।
প্রশ্ন: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কী ঘটছে?
জবাব: রাখাইন রাজ্যে যা ঘটছে তা আসলে গণহত্যা। গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তিবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২-এ গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ বা গ্রুপের ওপর সামগ্রিকভাবে বা এর অংশবিশেষকে ধ্বংস করার জন্য ক. গ্রুপটির সদস্যদের হত্যা করা হয়, খ. গ্রুপটির সদস্যদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি করা হয়, গ. গ্রুপটির জীবনযাত্রা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, ঘ. গ্রুপটির নতুন শিশু জন্মে বাধা দেওয়া হয়, ঙ. গ্রুপটির শিশুদের অন্য গ্রুপে হস্তান্তর করা হয়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সব পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেজ স্বীকার করেছেন, মিয়ানমারে জাতি নির্মূল হচ্ছে। জাতি নির্মূলের মধ্যে গণহত্যাও রয়েছে। তিনি গণহত্যা শব্দটি ব্যবহার করেননি এ কারণে যে তাতে গণহত্যা কনভেশনটি অনুসরণ করতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু তিনি জানেন, নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি হলে রাশিয়া ও চীন তাতে ভেটো দেবে। এখানেই রয়েছে সঙ্কট।
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ দিন মিয়ানমারের শান্তি-প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছেন। শান্তি-প্রক্রিয়া কতটুকু জটিল সেখানে?
জবাব: মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখনো বিশ্বাস করে শক্তিই আসল কথা। সাবেক প্রেসিডেন্ট থিন সিন, তিনি নিজেও ছিলেন সামরিক বাহিনীর জেনারেল, শান্তি আলোচনার আহ্বান জানালেও তারা সেটা বিলম্বিত করে দিয়েছিল। তিনি ২০০৮ সালের সংবিধানে শান্তি আলোচনাকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। কিন্তু সু চির অধীনে সামরিক বাহিনী শান্তি আলোচনাকে নিরাপত্তাগত বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছে। ফলে বিষয়টি চলে গেছে সামরিক বাহিনীর হাতে। এর অর্থ হলো যারা সরকারের মতানুযায়ী শান্তি আলোচনায় রাজি হবে না, তাদের প্রতি শক্তি প্রয়োগ করা হবে। প্রতিরোধ চালানো হলে তাদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে তাদের ওপর পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিভাবে শান্তি আলোচনা চালানো যেতে পারে, সে ব্যাপারে সুচির কোনো কৌশল বা পরিকল্পনা নেই।
প্রশ্ন: মিয়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনী ১৩৫টি জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রোহিঙ্গাদের টার্গেট করল কেন?
জবাব: মিয়ানমারের কমান্ডার-ইন-চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হলাইং ১ সেপ্টেম্বর বলেছেন, উত্তর রাখাইনে চলমান শুদ্ধি অভিযান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অসমাপ্ত কাজ’। যুদ্ধের পর ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় কিছু রোহিঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হতে চেয়েছিল। মুজাহিদ গ্রুপ হয়েছিল, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেটা নস্যাৎ করে দেয়। যাই হোক, জেনারেল মিনের ‘অসমাপ্ত কাজের’ অর্থ হলো তিনি ১৯৬০-এর দশকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া রাজনৈতিক নিষ্পতিতকে মেনে নিচ্ছেন না।
সামরিক বাহিনী ১৯৪৭ সালের সংবিধানকেও স্বীকার করে না। ওই সংবিধানে বলা হয়েছিল, স্বাধীনতার সময় মিয়ানমারের ভূখ-ে বসবাসকারী সবাই এই দেশের নাগরিক। এ কারণেই ১৯৭৮ সালে ক্ষমতা নিয়ে জেনারেল নে উইন রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার জন্য অভিযান চালিয়েছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনও পরিবর্তন করেছিলেন। রোহিঙ্গাদের সরিয়ে দিতে ১৯৯৮ সালেও আরেকটি চেষ্টা হয়েছিল।
তৃতীয় ও বর্তমান ধারাটি হলো জাতিকে একক ও ‘বিশুদ্ধ’ করার একটি চেষ্টা। এটা বর্ণবাদী নীতি। রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ায় তাদের বিতাড়িত করতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া খুব সহজ। এই বৌদ্ধরা মনে করে, বৌদ্ধ ধর্মকে বাইরের সব প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা তাদের কর্তব্য।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। সু চি গণতন্ত্রকে মজবুত করবেন, সামরিক স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ করে দেবেন বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়ে থাকে, তা সম্পূর্ণ ভুল।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি ইরানের শাহের আমলের মতো। শাহ নিজে ক্ষমতা সুসংহত করে নিজস্ব ঘরানার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছিলেন। মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীন এনএলডির মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। সু চি নিজে সব সিদ্ধান্ত নেন। তরুণদের বিকশিত হওয়ার কোনো সুযোগ দেন না। অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত বরদাস্ত করা হয় না।
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে মিয়ানমারে চলমান পরিস্থিতির নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক কোনো ইস্যু আছে কি?
জবাব: আগেই বলা হয়েছে, ভূ-রাজনীতির ভূমিকা আছে। চীন তার আঙিনা মনে করে মিয়ানমারকে। রাশিয়া বা চীন চায় না মিয়ানমার পাশ্চাত্য বলয়ে চলে যাক।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনী চায় না, দেশে বেসামরিক শাসন চলুক। ২০১২ সালে যখন থিন সিন সরকার সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করতে চাইলেন, তখন রোহিঙ্গা সঙ্কট দেখা দেয়। ২০১৬ সালে সু চি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সঙ্কট প্রবলভাবে দেখা দেয়। যখন দেখা গেল, সু চি শান্তি আলোচনা ঠিকমতো চালাতে পারছেন না, তখন তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের চূড়ান্তভাবে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলো।
প্রশ্ন: মিয়ানমারের বাকি লোকজন এই সঙ্কটে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে?
জবাব: ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত না হলে বেশির ভাগ লোক প্রতিক্রিয়া দেখায় না। জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে সত্য। রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না। তবে বেশির ভাগ লোক সরকারি বক্তব্যকেই সমর্থন করে: রোহিঙ্গারা বিদেশী, তাদের চারটি করে স্ত্রী আছে, তাদের জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, তারা মিয়ানমারকে ইসলামি দেশে পরিণত করতে চায়।
প্রশ্ন: এই সঙ্কটের সমাধান কোথায়?
জবাব: সঙ্কটটি দুই মাত্রিক। একটি হলো গণতন্ত্রের সঙ্কট। তা হলো আমরা কিভাবে ভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় আসা রোধ করব, কিভাবে দেশে গণতন্ত্র মজবুত হবে? সমাধান নির্ভর করছে মিয়ানমারের জনগণের ওপর। তাদের উচিত হবে এগিয়ে আসা। এখনো খুব বেশি দেরি হয়নি। ২০২০ সালের আগে আমাদের হাতে আরো তিন বছর আছে।
আরেকটি সঙ্কট হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। আমাদের হাতে সময় নেই। লাখ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে, মারা যাচ্ছে। সরকারের অস্বীকৃতি সত্ত্বেও শুদ্ধি অভিযান চলছে। জাতিসঙ্ঘ, বাংলাদেশ এবং অন্য প্রতিবেশীদের এগিয়ে আসতে হবে এদের রক্ষা করার দায়দায়িত্ব পালনে। তারা উদ্যোগ না নিলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বের করে দেওয়া হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান রয়েছে এই ধারণায় যে রোহিঙ্গারা ঈশ্বরের অবয়বে তৈরি মানুষ, মিয়ানমারের সমান মর্যাদার নাগরিক।
এই বিশ্বাস মিয়ানমার সরকারকে নৈতিকভাবে সাহসী করবে, দীর্ঘ মেয়াদি ভিত্তিকে মিয়ানমার থেকে বর্ণবাদী কর্মসূচি নির্মূল করতে, ধর্মীয় গোঁড়ামি উচ্ছেদ করতে। এটা হবে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মতো।
নিজের ফেসবুক পেজেই অপমানিত হচ্ছেন সু চি
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন, সেই হত্যাযজ্ঞের মুখেও নিশ্চুপ থাকা এবং এক পর্যায়ে উল্টো সেনাবাহিনীকে সমর্থন করে বক্তব্য দেয়ায় দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেতা অং সান সু চি তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন। এমন অমানবিক অবস্থান নেয়ায় তার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ মিছিল, র‌্যালি করে ইতোমধ্যেই সু চি’র নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেয়ার দাবি উঠেছে।
আর এখন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদকারীদের তীব্র সমালোচনা আর আক্রমণের মুখে পড়েছেন সু চি। নিজের ফেসবুক পেজেই বিভিন্ন পোস্টে কটাক্ষ আর প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাকে।
সু চি’র পেজের শুধু কাভার ফটোতেই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কমেন্ট বা মন্তব্য পোস্ট হয়েছে সাড়ে ১৭ হাজারের মতো, যার সিংহভাগই করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানিয়ে। কমেন্টগুলোতে প্রশ্ন করা হয়েছে, মানবাধিকারের কথা বলে ক্ষমতায় আসা সু চি কেন এখন মানবতাবিরোধী এমন একটি সরকারি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? বলা হয়েছে, সু চি যেন তার নোবেল ফিরিয়ে দেন, কারণ তিনি আর এর যোগ্য নন।
কাভার ফটোতে দেখা যাচ্ছে সু চি শপথ নিচ্ছেন। আলামিন নীরব নামের একজন সেখানে কমেন্ট করেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। এখন আপনার মানবিকতা কোথায় গেল? আপনার নোবেল পুরস্কার তাহলে কোন শান্তির কথা বলে? আমরা আপনাকে ঘৃণা করি। এটা একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ। দ্রুত এসব বন্ধ করুন।
মিয়ানমারের অন্যতম বড় সমর্থক রাষ্ট্র হলো চীন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মিয়ানমার আসলে অনেক ক্ষেত্রেই চীনের হাতের পুতুল। চীনের সঙ্গে ঠিকঠাক স্বার্থ বজায় রাখার জন্য মিয়ানমার সরকার এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেয় যা নিজ দেশের তুলনায় চীনের জন্য বেশি লাভজনক। সেই সূত্র ধরেই নাসিমুল শুভ ছবির কমেন্টে সু চি’কে চীনা পুতুল বা ‘চাইনিজ ডল’ বলে অভিহিত করেছেন।
সারোয়ার আহমেদ উচ্ছাস নামের এক ব্যক্তি তো তাকে সরাসরি ‘নারী সন্ত্রাসী’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ছবিটিতে মন্তব্যকারী সবাই যে রোহিঙ্গা ঢলে আক্রান্ত বা উদ্বিগ্ন বাংলাদেশি তা না। সবাই মুসলিমও নন। কিন্তু নির্যাতন বন্ধের ইস্যুতে তারা প্রায় সবাই-ই একমত। এমনই একজন কমেন্টকারী হলেন কেটি ডাউলিং।
তিনি লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের এখন কী হবে? এটি একটি গণহত্যায় রূপ নিতে যাচ্ছে এবং রূপ নিতে সফলও হবে যদি মিয়ানমার একে ঠেকাতে এখনই কোনো নির্ণায়ক পদক্ষেপ না নেয়। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত অং সান সু চি।’
অবশ্য ভিন্নমতও আছে। যেমন, কেটি ডাউলিংয়ের কমেন্টের প্রথম জবাব দানকারী আল অং নামের এক ব্যক্তি সু চি’র পক্ষ নিয়ে কেটির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। বলেন, ‘আপনারা সুপ্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত এবং ধনী একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করেন যেখানে স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। যেখানে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ আইনের রাজত্ব চলে এসেছে বহু শতাব্দী ধরে। মিয়ানমারে তো এখনো শান্তিই আসেনি। গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিছুদিন আগেও এখানে কোনো নাগরিক বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিল না। দেশটি খুবই দরিদ্র ও এখনো লড়েই যাচ্ছে। এখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ নানা সুবিধা একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আপনাদের উচিত এখানে বৃহৎ স্বার্থটা চিন্তা করা এবং আবেগপ্রবণ হয়ে সু চি’কে আক্রমণ করার আগে ওপরের সবগুলো বিষয় মাথায় রাখা। দয়া করে একটু পড়াশোনা করে দেখুন কীভাবে দখলদার ব্রিটিশরা নির্মমভাবে বার্মিজদের হত্যা করেছিল। তখন কোথায় ছিল মানবাধিকার?’
এর জবাবে কেটি ডাউনিং সরাসরিই বলেছেন: অতীতে যা হয়েছিল তা অবশ্যই খারাপ ছিল। কিন্তু বর্বরতার শিকার এক গোষ্ঠী পরে আরেক গোষ্ঠীর সঙ্গে একই বর্বর আচরণ করলেও তা যুক্তিযুক্ত হয়ে যায় না। ‘ঠিক যেমন ইহুদি জনগোষ্ঠী নিজেরা অতীতে দমন-পীড়নের শিকার ছিল বলেই তারা ফিলিস্তিনিদের দমিয়ে রাখতে পারে না। নিজের অতীতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অন্যদেরও একই নিষ্ঠুরতার শিকার আপনি করতে পারেন না। একটি একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু।…… প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বার্মায় বসবাসের পরও তাদেরকে (রোহিঙ্গা) রাষ্ট্রবিহীন হিসেবে বাঁচতে হচ্ছে। আর অং সান সু চি যদি কৌশলী হওয়ার চেষ্টাই করছেন, তবে কেন ক্যামেরায় কেন তাকে ‘অফ দ্য রেকর্ড’-এ মুসলিমবিরোধী কথাবার্তা বলতে দেখা গেল? গণতন্ত্র কখনো একই দেশের মধ্যে এক দলকে অন্য দলের ওপর সুবিধা দেয়ার কথা বলে না।’মিয়ানমার-রোহিঙ্গা-অং সান সু চি
কেটি ডাউনিংয়ের এ বক্তব্যের সমর্থন করেছেন বহু মানুষ। তাদেরও একই কথা। নিজের নির্যাতনের ইতিহাসকে অন্যকে নির্যাতন করার কাজে যুক্তি হিসেবে ব্যবহারকে নিজেরই ইতিহাসকে অসম্মান করা বলে উল্লেখ করেছেন অনেকে। কেটির কমেন্টে এ পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি রিঅ্যাকশন এসেছে।
ইউসুফ সামাদি নামের একজন লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি অ্যাডলফ হিটলারের নারী সংস্করণের সঙ্গে: অং সান সু চি।’ এর জবাবে কেউ কেউ বলেছেন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে খারাপ ঠিকই হচ্ছে। তবে সু চি’কে হিটলার বলাটা আবার বেশি হয়ে যায়। কেউ আবার বলেছেন, হিটলার না, সু চি হলেন নারী মুসোলিনি।
মো ওয়াই নামে মিয়ানমারের একজন ইউসুফ সামাদির এই মন্তব্যের জবাবে বলেছেন, ‘তোমরা মুসলিমরা বারবার মানবাধিকার মানবাধিকার করছো। কিন্তু এমন কিছু মিয়ানমারের আইনে উল্লেখ নেই! আমাদের দেশ মিয়ানমারে মুসলিমদের জন্য জায়গা নেই। সুতরাং তারা মিয়ানমারে থাকতে পারবে না! তোমরা নিজ মাতৃভূমিতে চলে যাও!’
মো ওয়াইয়ের এ ধরণের জবাবের প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন বহু মানুষ। কেউ কড়াভাবে, কেউ আবার বুঝিয়ে তার মুসলিম বিদ্বেষী কথার উত্তর দিয়েছেন।মিয়ানমার-রোহিঙ্গা-অং সান সু চি
এছাড়াও অনেকের বক্তব্য ছিল, তারা আগে অং সান সু চি’কে খুব পছন্দ করতেন। এমনকি মানবাধিকারের জন্য লড়াই করা গৃহবন্দী সু চি’কে ভালোও বাসতেন তারা। মানবতার পক্ষে লড়াইয়ের প্রতীক মনে করতেন। কিন্তু এখন সু চি তাদের কাছে ঘৃণিত একটি নাম।
যেমন, করিম হামিদ লিখেছেন, ‘আপনি এতদিন আমার পছন্দের তালিকায় ছিলেন। এখন চলে গেছেন অপছন্দের তালিকায়। রোহিঙ্গাদের প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছেন? আপনি মানুষ নামের কলঙ্ক।’
একইভাবে বিল এডওয়ার্ডস নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘অং সান সু চি – বহু বছর আগে, আমি আপনাকে একজন হিরো হিসেবে গুণগান করতাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, আপনি একেবারেই ভুয়া একজন মানুষ যিনি ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে আছেন। আর এবার আপনি নিজেকে একজন গণহত্যাকারী দানব হিসেবে প্রকাশ করলেন। এক নারী হিটলার। আপনার স্থান যেন নরকে হয়।’
এভাবে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, বোঝানো, ধমকানো, তর্কবিতর্ক ছাড়াও রোহিঙ্গাদের বিপদমুক্তি এবং সু চি ও তার সরকারের শুভবুদ্ধির উদয়ের প্রার্থনা জানিয়েও কমেন্ট করেছেন বহু ফেসবুক ব্যবহারকারী।
এমনই আরও অসংখ্য মন্তব্য এসেছে সু চি’র পেজের কাভার ফটোতে। যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অন্যান্য পোস্টগুলোও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই।
http://telegrapbd.com/world/2179

Share.
Loading...

Comments are closed.