
Farmer Asin Chandra Shikari becomes self-reliant in cultivating colourful cauliflower.
পটুয়াখালী: কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে রঙিন ফুলকপি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন কৃষক অসিম চন্দ্র শিকারি। নিজের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মনোহরপুর গ্রামের মডেল কৃষক এখন তিনি। তার চাষকৃত নানান রঙের রঙিন ফুলকপির সৌন্দর্য দেখতে শুধু গ্রামের সাধারণ মানুষ নয়, দূর দূরান্ত থেকে কৃষি প্রেমি মানুষ ছুটে আসছেন তার কৃষি ক্ষেতের কাছে। তার কৃষি কাজের সফলতায় এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষি কাজে।
জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার সদর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের স্বর্গীয় যোগেশ চন্দ্র শিকারী'র বড় ছেলে অসিম চন্দ্র শিকারি (৩৮)। দুই পুত্র, স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে অভাব অনটনে চলছিল সংসার। কয়েক বছর আগেও ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত অল্পসংখ্যক চাষের জমিতে আমন জাতের বিরি-৪৯, বিরি-৫১ ধান চাষ করে উৎপাদিত ফসলেই নির্ভরতা ছিল অসিম চন্দ্র শিকারির। এরপর কৃষির প্রতি একাগ্রতা, নিজের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মৌসুম ভেদে খাদ্য ও সবজি চাষে নিজেকে যুক্ত করেন অসিম। এভাবেই রঙিন ফুলকপি চাষেও সফলতার মুখ দেখেন তিনি। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীদের সার্বক্ষণিক পরামর্শে মনোহরপুর গ্রামের এখন সফল কৃষক তিনি। ক্ষেতে বসেই তার অধিকাংশ কৃষি পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। এছাড়া নিকটস্থ মহিপুর, আলিপুর বাজারে ক্ষেতের উৎপাদিত কৃষি পণ্য বিক্রি করেই সচল এখন তার পরিবারের অর্থনীতির চাকা। তার বড় ছেলে অভিজিৎ শিকারি মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে অপূর্ব শিকারি একই স্কুলের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পরিবার-পরিজন ও কৃষি নিয়েই এখন সময় কাটে তার। কৃষি কাজে তার সফলতার গল্প জানতে কথা হয় তার সাথে।
কৃষক অসিম চন্দ্র শিকারি বলেন, শুধু ধান চাষ ও গাভী পালন করে ছেলেদের পড়াশোনাও সংসার চালানো দুষ্কর হয়ে উঠেছিল। এরপর কৃষি কাজ করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রথমে ৪৩ শতাংশ জমিতে ভুট্টা চাষ করি। ভুট্টা চাষের সফল হওয়ার পর বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করি রঙিন ফুলকপি চাষ। নিজের তৈরী জৈব সারের প্রয়োগ করে নিজের দক্ষতা ও মেধায় ফুলকপি চাষে সফল হওয়ার পর স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে ব্যাপক পরিসরে মাঠে চাষ শুরু করি রঙিন ফুলকপির। মিষ্টি পানির সংকট না থাকলে ১২ মাস জুড়ে আমার মাঠে থাকতো কৃষি ও ফসলের সমারোহ।
কৃষক অসিম চন্দ্র শিকারি আরও বলেন, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার জমি হওয়ায় আমাদের জমিতে লবণাক্ততা বেশি। তাই রঙিন ফুলকপি চাষের জন্য জমির লবণাক্ততা কাটাতে জমিতে চাষ দিয়ে পরিমাণ অনুযায়ী জিপসাম, ব্রোণ, জিংক, সালফার, টিএসপি ও জৈব সার প্রয়োগ করে প্রথমে জমি ফুলকপি চাষের জন্য প্রস্তুত করি। এক সপ্তাহ পরে বীজতলা থেকে ২৬ থেকে ৩১ দিন বয়সের রঙিন ফুলকপির চারা রোপন করি। ১৫ দিন পর ক্ষেতের গুড়ি পোকা নিধনের জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করি। এছাড়া ৩ মাস লিকুইড হান্ডওয়াশ ও গুল ব্যবহার করে ম্যানুয়াল পদ্ধতির কীটনাশক তৈরি করে ক্ষেতে স্প্রে করি। এভাবেই ক্ষেতে বেড়ে উঠতে থাকে লাল, বেগুনি, সবুজ, হলুদ, খয়েরি, সাদা ও ঘিয়া রঙের হাজার হাজার ফুলকপির চারা। এক সময় যার প্রতিটির ওজন হয় সর্বোচ্চ দুই কেজি এবং সর্বনিম্ন এক কেজি ২০০ গ্রাম। ক্ষেতে বসে রঙিন ফুলকপি প্রতি পিচ ১০০ টাকা দরে বিক্রি করার পর উদ্বৃত্ত ফুলকপি স্থানীয় বাজারে কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এভাবে এ বছর বিঘা প্রতি বিক্রি আসে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। আর বীজ, সার ও সেচ খরচ বাবদ বিঘা প্রতি খরচ হয় মাত্র ২০-২২ হাজার টাকা।
কৃষক অসীম বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ ভাই ও কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আরাফাত হোসেন স্যার আমাকে মাঠে এসে বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়ে সহায়তা দিয়েছেন। কৃষি অফিস থেকে তারা আমাকে ক্ষেতে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার জন্য প্রনোদনা দিয়েছেন । আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই এখন অলস সময় পার না করে সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে কৃষি কাজে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আরাফাত হোসেন বলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এবং কৃষি খাতে বিদেশ নির্ভরতা কমাতে আমাদের বেশী বেশী কৃষিকাজ করার বিকল্প নেই। কলাপাড়া উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ লব্ধ জ্ঞান প্রয়োগে মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে।
আরাফাত হোসেন আরও বলেন, এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে কৃষকের উৎপাদিত ফসল, সবজি ও কৃষি পন্য এখন দেশের অভ্যন্তরেও বিদেশে চলে যাচ্ছে। এতে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে কৃষক। স্বচ্ছলতা ফিরেছে কৃষকের পরিবারে। - গোফরান পলাশ