
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি
সোমবার (৪ মে) দুপুরেই ভোটের ফল মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখনই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখন লোকভবনে যাবেন? কখন পদত্যাগ করবেন? কারণ, সেটাই রীতি। মমতার আগের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীরা তেমনটাই করে এসেছেন। মমতা যখন সোমবার রাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল থেকে বের হন, অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, এরপরে তিনি লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দেবেন। কিন্তু মমতার গাড়িবহর চলে যায় কালীঘাটে তার বাড়ির পথে।
কৌতূহল তখনও ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে মমতা সরাসরি জানিয়ে দিলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না।! কারণ, তিনি ‘হারেননি’। তাই লোকভবনে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।
মমতা বলেছেন, কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?
মমতা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা না-দেন, তা হলে কী হবে? কী বলছে সংবিধানের নিয়ম?
জানা যায়, এমন পরিস্থিতির বিষয়ে নির্দিষ্ট উল্লেখ করে সংবিধানে কিছু বলা নেই। কারণ, কোনো মুখ্যমন্ত্রী ভোটে পরাস্ত হয়েও যে রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেবেন না, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে কেউ মনে করেননি। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু ধারণার কথা বলছেন, যা অতীতে কোনো না কোনো রাজ্যে ঘটেছে। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না দেয়ার নজির ভারতে নেই।
ফলে মমতা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ না করলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে, বৃহস্পতিবার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু ৭ তারিখ পেরোলেই তার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেয়াটা ‘নিয়ম’ নয়। এটি সাধারণভাবে রেওয়াজ, রীতি বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার। যেমন ১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর ১টা নাগাদ ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে ইস্তফাপত্র তুলে দিয়েছিলেন।
শুধু তা-ই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়িতে করে।
বিজেপি নতুন সরকার গঠন করবে। কিন্তু কবে সেই সরকারের শপথ হবে তা মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতা থেকে একটি ইঙ্গিত মিলেছে যে, বিজেপি আগামী শনিবার (৯ মে) রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথগ্রহণের কর্মসূচি করতে পারে। রাজ্য বিজেপির বিভিন্ন সূত্র থেকেও তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বুধবার (৬ মে) রাতে কলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র। রাতেই তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন। যিনি পরিষদীয় দলের নেতা হবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। তিনিই রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আর্জি জানাবেন। তারপর হবে শপথগ্রহণ।
যদি ৮ মে শপথগ্রহণ হয় একরকম। তা হলে ৭ তারিখে তৃণমূল সরকারের মেয়াদ শেষ এবং ৮ তারিখে শপথগ্রহণের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকবে না। তা না হয়ে ৯ তারিখ বা তার পরের কোনো দিনে শপথগ্রহণ হলে মধ্যবর্তী স্বল্পসময় রাজ্যপাল পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন এবং তা হবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে।
কলকাতা হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘তদারকি’ (কেয়ারটেকার) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যপাল কাজ চালানোর অনুরোধ করেন। তেমন কেউ না হলে তিনি নিজে এক-দু’দিন তদারকি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করারও সংস্থান রয়েছে। কিন্তু সাধারণত এত কম সময়ের জন্য ‘সংকট’ না-হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা না-ও হতে পারে।
তবে সবটাই নির্ভর করছে বিজেপি পরিষদীয় দল শপথের দিনক্ষণ কবে চূড়ান্ত করে তার ওপরে। কিন্তু মমতা ইস্তফা না দিলে কোনো সংকট তৈরি হবে না। কারণ, বিধানসভার মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। তবে প্রচলিত ‘রীতি’ না-মানায় তার ভাবমূর্তির ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা সময়ই বলবে।