
ক্লাব ফুটবলের অন্যতম রোমাঞ্চিত ম্যাচ, দুই স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ‘এল ক্লাসিকো’র লড়াই। যে ম্যাচ দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকেন কোটি ফুটবলপ্রেমী। যে ম্যাচে শুধু ফুটবল খেলা হয় না--যেমন থাকে মাঠের লড়াইয়ের উত্তাপ, তেমন থাকে দুই শহরের ইতিগহাস, ঐতিহ্য আর আবেগের লড়াই। সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা।
আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) দিনগত রাত ২টায় বার্সেলোনার ঘরের মাঠ ক্যাম্প ন্যূতে লা লিগার ম্যাচে মুখোমুখি হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা। ক্লাব ফুটবলের অন্যতম এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি বাংলাদেশে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করবে টি-স্পোর্টস। অনলাইনে দেখা যাবে স্পোর্টসজিফাই, ক্রীড়া টিভির মতো প্ল্যাটফর্মে।
এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে রিয়ালকে হারাতে পারলে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান একলাফে ৯ পয়েন্টে বাড়িয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থাকছে হ্যান্সি ফ্লিকের দলের সামনে। তবে বার্সা কোচ জানিয়েছেন, মাঠের লড়াইয়ে তারা কেবল ৩ পয়েন্টের জন্য নামলেও ‘এল ক্লাসিকো’র গুরুত্ব কেবল পয়েন্ট টেবিলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়।
এদিকে ম্যাচ শুরুর আগে অবশ্য কিছুটা চাপে রয়েছে স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নরা। ঠিক গত সপ্তাহেই উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) কাছে হেরে চলতি মৌসুমে নিজেদের প্রথম হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছে বার্সা। তবে ওই ম্যাচের ভুলত্রুটিগুলো শুধরে নিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নামাই এখন চ্যালেঞ্জ হবে কাতালানদের জন্য।
বিপরীতে রিয়াল মাদ্রিদ বেশ ভালোভাবেই ছন্দে ফিরেছে। টানা চার ম্যাচ জেতার আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামবে তারা। গত বুধবারই চ্যাম্পিয়নস লিগে আরবি লাইপজিগকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে লস ব্লাঙ্কোসরা। হোসে মরিনিয়ো রিয়ালের ডাগআউটে ফেরার পর যেন দল হিসেবে গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছে তারা।
ম্যাচে রিয়াল জয় তুলে নিতে পারলে পয়েন্ট ব্যবধান তো কমবেই, পাশাপাশি শেষ সাত এল ক্লাসিকোর মধ্যে ছয়টিতে হেরে যাওয়া রিয়াল শিবিরের জন্য এটি হবে বড় এক মানসিক শক্তি। বিশেষ করে, অভিজ্ঞ কোচ হোসে মরিনিয়োর ফেরাটা এই ঐতিহ্যবাহী দ্বৈরথকে দিয়েছে বাড়তি মশলা।
৬৩ বছর বয়সী পর্তুগিজ কোচ এর আগে বার্সেলোনার বিপক্ষে ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন ২৭ ম্যাচ। এর মধ্যে রিয়ালের কোচ হিসেবে ১৭টি ক্লাসিকোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ২০১০ সালে পেপ গার্দিওলার অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনার সঙ্গে টক্কর দিতেই প্রথম মরিনিয়োকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ক্লাব প্রেসিডেন্ট ফ্লরেন্তিনো পেরেজ।
ফ্লিকের বার্সেলোনা যেখানে গত দুই মৌসুমে টানা লা লিগা ট্রফি জিতেছে এবং চলতি মৌসুমে লিগের প্রথম ৯ ম্যাচের সবকটিতে জিতে উড়ছে, ঠিক সেখানে বড় কোনো ট্রফি ছাড়াই গত দুই মৌসুম কাটানো রিয়ালের দায়িত্ব নিয়েছেন মরিনিয়ো। চলতি লিগে ইতোমধ্যে দুটি ম্যাচও হেরে গেছে তার দল।
এল ক্লাসিকোর এই লড়াইয়ে নিজেদের ফেভারিট মানতে নারাজ মরিনিয়ো বলেন, ‘আমাদের একটি পুরোপুরি প্রস্তুত দল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ফুটবলে করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। আমি মাত্র তিন মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি, প্রাক-মৌসুমে সবাই একসঙ্গে ছিল না, মাঝখানে আবার আন্তর্জাতিক বিরতি গেছে। আমরা এখনও শুরুর পথেই আছি। গত কয়েক বছর ধরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা আরেকটি দলের সঙ্গে আমাদের এই প্রাথমিক অবস্থার তুলনা করাটা একদমই ন্যায়সংগত নয়।’
অন্যদিকে, জার্মান কোচ হ্যান্সি ফ্লিক প্রতিপক্ষ রিয়ালকে নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক। মাদ্রিদ ক্লাব বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবে বলে মনে করেন তিনি। দুই দলের এই লড়াই শুধু তিন পয়েন্টের মধ্যে আটকে নেই। ক্লাসিকোর উত্তাপ আরও বেশি। ফ্লিকও তাই মনে করেন।
ফ্লিক বলেন, ‘এল ক্লাসিকো একদম আলাদা, আমাদের ফুটবলে এটিই সেরা ম্যাচ। সবাই এই লড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা সত্যি যে আমরা কেবল ৩ পয়েন্টের জন্যই খেলছি, কিন্তু এই ম্যাচের মাহাত্ম্য এর চেয়েও অনেক বেশি। এই লড়াইয়ের অংশ হতে পেরে আমি আনন্দিত এবং মুখিয়ে আছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত এবং দলের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
সবমিলিয়ে ব্যালন ডি’অরের ঠিক আগের দিন অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই এল ক্লাসিকো উত্তাপ এখন চরমে। ফুটবলের সবচেয়ে দামি এই ব্যক্তিগত পুরস্কার জেতার দৌড়ে একে অপরকে তীব্র টক্কর দিচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। দুজনেই দারুণ ছন্দে আছেন। রিয়ালের ফরাসি তারকা এমবাপ্পে লিগে ৯ ম্যাচে ৯ গোল করে এগিয়ে। আর ঠিক তার ঘাড়েই নিশ্বাস ফেলছেন ৮ গোল করা বার্সার উইঙ্গার ইয়ামাল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে বড় এক ধাক্কা খেয়েছে রিয়াল শিবির। দলের প্রধান ভরসা ও প্রাণভোমরা ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে ছাড়াই মাঠে নামতে হচ্ছে তাদের। চার ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় ম্যাচটি কাটাচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।
দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস একদম সমানে সমান। এ পর্যন্ত খেলা সব এল ক্লাসিকোতে দুই দলই সমান ১০৬টি করে ম্যাচ জিতেছে, আর ৫২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা—গত পাঁচ বছরে বার্সেলোনা জিতেছে ১০ বার, আর রিয়াল জিতেছে ৯ বার। এমনকি শেষ ১০ ম্যাচের মধ্যে ৬টিতেই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে বার্সা, বিপরীতে রিয়ালের জয় ৪টিতে।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান সমানে সমান হলেও, চলতি লিগ মৌসুমে ৯ ম্যাচের সবকটিতে জয় এবং ৩৯ গোল করে গোলমেশিনে পরিণত হওয়া বার্সেলোনাই আজ মাঠে পরিষ্কার ফেভারিট হিসেবে নামছে। তবে বলাই বাহুল্য, দুর্দান্ত ছন্দে থাকা কাতালানরা লিগের দশম রাউন্ডেই চলতি মৌসুমের সবচেয়ে বড় ও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে চলেছে।