
Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার
AI (Artificial Intelligence) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা কম্পিউটার বা মেশিনকে মানুষের মতো চিন্তা করতে, শিখতে এবং কাজ করতে শেখায়। এটি কম্পিউটারের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেখানে সাধারণত মানুষের বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়।
এআই জনক কে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এর জনক বলা হয় আমেরিকার কম্পিউটার বিজ্ঞানী জন ম্যাকার্থি (John Mccarthy)কে। তিনিই প্রথম ১৯৫৫ সালে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ পরিভাষাটির আনুষ্ঠানিক প্রচলন করেন এবং ১৯৫৬ সালে ডার্টসাউথ কনফারেন্সে এআই গবেষনার ক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও আধুনিক এআই ও ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির বিকাশে অ্যালান টুরিং (Alah Turing), জিওফ্রি হিন্টন ((Geoffrey Hilton) এবং ইয়ান লেকুন (Yahn lecun) এর মতো বিজ্ঞানীদের অবদান ও অনস্বীকার্য।
আমাদের অবস্থান:
আমাদের দেশে এআই অতি নতুন মনে হয়। অথচ এআই আবিষ্কার হয়েছে ১৯৫৫ সালে। দীর্ঘ সময় চলে গিয়েছে। কিন্তু আমরা এআই সম্পর্কে কিছু জানতে শুরু করেছি ২০২৪ সাল থেকে। আমাদের শিক্ষা ও কর্মজীবনে এআই ব্যবহার খুবই স্বল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার বিশ^জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নিজেদের কর্মক্ষেত্রের চিত্রকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের গতি বেশ ধীরে হলেও বাংলাদেশে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে মুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের গতি বৃদ্ধি করতে এবং খরচ কমাতে এআই ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে একদিকে যেমন কিছু প্রথাগত চাকরির ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পেশা ও দক্ষতার চাহিদা। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তি, সৃজনশীল খাত, কনটেন্ট বাইটিং কাস্টমার সার্ভিস এবং উৎপাদন খাতে আইএ প্রভাব নিয়ে আলোচনা সবার আগে। এমন এক রূপান্তর কালীন সময়ে প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের কোন খাতসমূহ সবচেয়ে পরিবর্তনের মুখে পড়ছে? আর বদলে যাওয়া এই বাজারে টিকে থাকতে পেশাজীবীদের বা কি ধরনের প্র¯দতি দরকার?
এআই পরিধি :
বাংলাদেশে এআই ব্যবহার বেশি দৃশ্যমান তা হচ্ছে ব্যাংকিং খাত, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম ও কাস্টমার সার্ভিস প্রধানতম। মূলত জটিল তথ্য বিশ্লেষণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্ষেপকরণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, চ্যাটবট পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রন এবং কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশে এ আই ব্যবহারঃ
এ আই টুলগুলোর ম্ধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ‘চ্যাটজিপিটি’। আমাদের দেশেও তার সকলের ব্যবহারে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। কনটেন্ট লেখা, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষনা, অনুবাদ, কোডিং থেকে শুরু করে নানা কাজে তা ব্যবহৃত হয়। এই টুলের পাশাপাশি ডিজাইন ও মার্কেটিং খাতে ক্যানভার এআই ফিচার, অ্যাডোবি ফায়ার ফ্লাই এবং মিডজার্নির মতো ভিজ্যুয়াল টুলগুলোর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অধিকাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠানে এ আইয়ের ব্যবহার এখনো পরীক্ষামূলকভাবে চলেছে। সকলের ধারণা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আমাদের দেশে এ আইয়ের প্রভাব সাধারণত ‘হোয়াইট কলার’ বা দাপ্তরিক চাকরিতে বেশি প্রয়োজন। কারিগরি বা উৎপাদন খাতে এর ব্যবহার এখনও বেশ কম। তবে এআইয়ের কারণে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। আমাদের মূল মনোযোগ দেয়া উচিত কারিগরিসহ নানা নতুন নতুন দক্ষতা বৃদ্ধিতে, তাহলে এআই নিয়ে ভীতি একেবারে কেটে যাবে।
নতুন সুযোগ সৃষ্টি বনাম ঝুঁকিঃ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সারা বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকে ভাবছেন এআই আসার ফলে কর্মসংস্থান কমে যাবে। পুরাতনদের চাকরি হারাতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষনায় দেখা গেছে প্রথাগত চাকরি কমলেও নতুন প্রযুক্তি নির্ভর চাকরির সংখ্যা বাড়বে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেটা এন্টি ও ক্লার্কিয়েল কাজ, প্রাথমিক স্তরের কাস্টমার সার্ভিস বা টেলিকলার এবং সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন ও ট্রান্সক্রিপশনের মতো পেশাগুলো সব চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে ডেটা সায়েন্স, এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার নিরাপত্তা, অটোমেশন ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উচ্চতর সৃজনশীল কাজের মতো খাতগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং উদীয়মান হিসেবে বেশ বিবেচিত। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি বা হ্রাসের চেয়ে এআই পরিবর্তন আনছে কাজের ধরনের। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে যে কাজ একজন মানুষ একাই করতো, এখন সেই কাজের কিছু অংশ করছে এআই, কিছু অংশ করছে মানুষ এবং অবশিষ্ট অংশ করছে মানুষ ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর টুলসের যৌথ উদ্যোগে। বিশে^র এই পরিবর্তনের হাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে। এআই এখন এক অনিবার্য বাস্তবতা। একে ভয় করা যাবে না বরং কিছু কিভাবে একে নিজের কাজে ব্যবহার করা যাবে তার কৌশল অর্জন করার চেষ্টা করতে হবে। বিভিন্ন পেশার মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয়ভাবে আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে এই ক্ষেত্রে বেশি বেশি কৌশলগত, নীতিগত সহযোগিতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনঃ
ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে কেবল মাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী বা নির্দিষ্ট কোন প্রযুক্তিগত শিক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রায় সব পেশায় এআই সম্পর্কে জানা ও ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যত বাজারে ডেটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি কিছু মানবিক গুণের কদর বৃদ্ধি পাবে বহু গুণ। এর মধ্যে বিশেষ করে সমালোচনামূলক চিন্তামতি, জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, কার্যকর যোগাযোগ ও দলগত কাজের যোগ্যতা এবং সৃজনশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কর্মজীবনের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে নিয়মিত নতুন দক্ষতা শেখা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত নিজকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বেশি যোগ্যতা।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাঃ
এআই চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ পিছিয়ে। কোন বিশ্ববিদ্যালয় সরকারীভাবে আলাদা কোন বিভাগ চালু করতে পারেনি। কোন কোন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স ও তথ্য প্রযুক্তি বিভাগে এআই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোর্স পড়ানো হচ্ছে। তাও খুব নগন্য। এই ক্ষেত্রে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটা এগিয়ে। বর্তমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এআই বিভাগ চালু করেছে। বিশেষ করে ইষ্টার্ন ইউনির্ভাসিটি সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কিছু কোর্স চালু করেছে। ইষ্টার্ন ইউনির্ভাসিটি এআই বিভাগ চালু করবে। ল্যাব ব্যয়বহুল ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবে এআই বিভাগ সকলে চালু করতে পারছে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে এআই চর্চা নাই বললেই চলে। দক্ষ শিক্ষক তৈরি এখন সময়ের দাবি।
এখন করণীয়ঃ ১. বাজারমুখী শিক্ষা পরিকল্পনায় আমাদের দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলো বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। কারিকুলাম পরিমার্জন করে এআই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কাজ করা উচিত। ২. এআই সম্পর্কে ধারণা ও প্রয়োজনীয়তা বিষয় সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ঘন ঘন করা উচিত। ১৯৫৫ সালে বিশ্বজুড়ে এআই চালু হলেও আমাদের দেশে আজও এআই অপরিচিত। সরকারকে এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে এআই ল্যাব স্থাপনে আর্থিক সহযোগিতা করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষনের জন্য জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশে যে সকল শিক্ষক বাংলাদেশী রয়েছে তাদেরকে দেশে এন এআই সম্পর্কে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ৩. স্কুল পর্যায়ে, কলেজ পর্যায়ে এআই বিষয় চালু করতে হবে। সরকার এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। ইংলিশ মাধ্যম স্কুল ও কলেজের এআই বিভাগ চালু করতে হবে। ইতিমধ্যে ওই কারিকুলামে চালিত স্কুলগুলোতে এআই বিভাগ চালু বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৪. এআই বিষয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্য পুস্তক তৈরির প্রকল্প সরকারকে হাতে নিতে হবে। সুন্দর, সহজ পাঠ্য পুস্তক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষায় প্রয়োজনীয় বিষয় সমেত পাঠ্যপুস্তক না হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই চালু কঠিন হবে। সর্বোপরি বিশে^র চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। এআই এখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জরুরী হয়ে পড়েছে। এআই সম্পর্কে অধিক জ্ঞান ও চর্চা আমাদের অর্থনীতি ও জীবনকে সহজ করে তুলবে।
সাবেক আবুল কাসেম হায়দার : লেখক: প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি, ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি: অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ ,সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম; সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সহ - সভাপতি এফবিসিসিআই। তাং-০১.০৭.২০২৬। Website: www.chintabhjabna.com, email- qhaider@youthgroupbd.com, Mobile ০১৫৫২৩৬৭৮৮৩