
Israel bombs South Pars gas field in Iran. AP Photo.
মোস্তফা কামাল মজুমদার
ইরানের দক্ষিন পারসে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরাইলের আক্রমণ ও জবাবে কাতারে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম এলএনজি প্যান্টে প্রত্যাঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি যুদ্ধের শুরু হিসেবে দেখছেন অনেক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটাকে ইসরাইলের একক কাজ বলে অভিহিত করলেও একাধিক ইসরাইলী পত্রিকার দাবী এ আক্রমণের সমন্বয় আগেই করা ছিল। কাতারে এলএনজি প্যান্টে আবার আক্রমণ করলে ইরানের দক্ষিণ পারসের সকল গ্যাসক্ষেত্র নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মর্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি বিশ্লেষণ করে বিবিসি মন্তব্য করেছে - যদিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবী করেন ইরানী গ্যাসক্ষেত্রে আক্রমণ ট্রাম্পের অজান্তেই হয়েছে, এ ব্যাপারে সত্য নির্ণয় করা কঠিন।
ইতিপূর্বে সামরিক কাজে ব্যবহারের খোড়া অজুহাতে তেহরানের কয়েকটি তেল শোধনাগার ইসরাইল বোমা বর্ষণ করে জ্বালিয়ে দেয়।
প্রশ্ন উঠেছে, এ যুদ্ধের লক্ষ্য কি? এবং তার শেষ কোথায়? জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতার অনুষ্ঠিত বৈঠকের সমাপ্তি না টেনে ২৮ ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানের উপর অঘোষিত যৌথ আক্রমন শুরু করে। কথিত লক্ষ্য সেদেশের শাসক শ্রেণীর পরিবর্তন করা। ইরান এবার যখন গত-জুনে একই রকম যৌথ আক্রমণের আরো সমন্বিত জবাব দেয়, তখন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইসরাইল বোমা বর্ষণ শুরু করবে জেনে তারা আক্রমণে যোগ দেয়। তা নাহলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপর আক্রমণ করত। এ যুক্তি কেউ মেনে নেয়নি।
বর্তমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের উপরের স্তর ধংস করে দিয়েছে। কিন্ত আক্রমণের জবাব থামছেনা। যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক জো কানট এ যুদ্ধকে অযৌক্তিক ও বেআইনি আখ্যায়িত করে পদত্যাগ করেছেন। ই-উ বা নেটো সবাই এ যুদ্ধের শরিক হতে নারাজ। জাপান প্রশ্ন তুলেছে, যুদ্ধে যাবার আগে কেন মিত্রদের পরামর্শ নেয়া হলনা। রাশিয়া বলেছে এ যুদ্ধ বেআইনি। চীন যুদ্ধ বন্ধের আহবান জানিয়েছে।
বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশসমূহের জন্য এ যুদ্ধের ক্রমাগত ব্যাপ্তি বৃদ্ধি এবং তেল ও গ্যাস শোধনাগারে বোমাবর্ষণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যুদ্ধ বন্ধ হলেই মঙ্গল। বর্তমান বিশ্বে একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ ইরান ঠেকিয়ে যাচ্ছে। এ আত্মরক্ষার যুদ্ধ মনে হয় ইরান চালিয়ে যাবার সক্ষমতা রাখে।
আমেরিকার কলমবিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জিওফেরি সাকস বলেছেন আমেরিকা এ যুদ্ধে বিফল হবে। সুইডেনের ইতিহাসবিধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়ান লুনদিয়াস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে হারাতে পাবেনা। তবে যুদ্ধ যখন শেষ হবে তখন ইরানের কোন কিছুই অক্ষত থাকবেনা। তাহলে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের মতই চার হাজার বছরের সভ্যতা সমৃদ্ধ ইরান মধ্যপ্রাচ্যের পঞ্চম ধংসপ্রাপ্ত দেশ হতে চলেছে?
গেল জুনে যুদ্ধ চলেছিল ১২ দিন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে যুদ্ধ বিরতি হয়। এবার মনে হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ইসরাইল ইরান আক্রমণ করেছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র এসেছিল সহায়ক শক্তি হিসেবে। এবার করছে সর্বাত্মক যুদ্ধ। ইরান বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি এবং ইসরাইল উভয়কে একই সাথে মোকাবেলা করে চলেছে।
গত জুনে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুললা আলী খামেনীর প্রাণ নাশের হুমকি দিলে তিনি বিপ্লবি গার্ডের কাছে কমান্ড বুঝিয়ে দেন। এবার প্রথম দিনেই তাকে এবং বেশ কিছু সামরিক নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু তাতে প্রতিরোধ থেমে যায়নি। পেন্টাগন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আরো ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্ধ চেয়েছে।
এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ইয়োরোপিয় মিত্ররা কূটনৈতিক পন্থায় খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার কথা বলছে। নিজ দেশে সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্তে ট্যারিপ যুদ্ধে নিরস্ত্র হয়ে পড়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বীরের বেশে নিজের শক্তি ফিরে পেতে কি এ যুদ্ধ শুরু করেছেন? এ প্রশ্ন অনেক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকের।