News update
  • State Minister Amit urges global firms to join BD offshore bidding     |     
  • Heart Disease Linked to 777 Daily Deaths in Bangladesh     |     
  • US Tech Firms Eye Over $1b Investment in Bangladesh     |     
  • Dhaka ranks 6th globally in air pollution on Tuesday     |     
  • Netanyahu Secretly Visits UAE Amid Rising Regional Tensions     |     

তমদ্দুন মজলিস সংগঠনটিই কি প্রথম বাংলা ভাষার দাবি তুলেছিলো?

বিবিসি নিউজ বাংলা শিল্প-কারুশিল্প 2025-02-20, 7:51pm

wrwwer-1344b7331a485ca7ec99ab5edd4bd7c41740059518.jpg




বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চলে কয়েক বছর ধরে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে রক্তপাত। অনেকের আত্মদানে অবশেষে ভাষা হিসেবে বাংলা পাকিস্তানের 'অন্যতম রাষ্ট্রভাষার' স্বীকৃতি পায় ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্রে।

ভাষা সংগ্রামী ও গবেষকদের মতে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ইস্যুটি প্রথম সামনে এনেছিলো তমদ্দুন মজলিস নামের সংগঠন, যেটি ছিল মূলত ইসলামি ভাবধারায় বিশ্বাস করা একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন।

যদিও দেশভাগের পর নতুন গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে–– তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিলো ভারত ভাগের আগেই, বিশেষত কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। তারা কেউ শুধু উর্দুর পক্ষে ছিলেন, আবার কেউ সেটির বিরোধিতা করেছেন।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বদরুদ্দীন উমর তার 'পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' নামের বইতে লিখেছেন, তখন কীভাবে ছোট বড় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, কিছু ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন, আর শিক্ষক-অধ্যাপক-চিন্তাবিদরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করেছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপক মিলে 'তমদ্দুন মজলিস' নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করেন, যারা শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে জনমত তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন।

"ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রয়াসের প্রাথমিক কৃতিত্ব গণ আজাদী লীগের। এর পর এ আন্দোলন বেগবান করতে সবচেয়ে অবদান রেখেছে অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তমদ্দুন মজলিস," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম।

কী জানা যাচ্ছে তমদ্দুন মজলিস সম্পর্কে

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, "দেশে ইসলামী আদর্শ ও ভাবধারা সমুন্নত করার প্রত্যয় নিয়ে ভারত বিভাগের অব্যবহিত পরেই ঢাকায় গড়ে উঠে এই সংগঠনটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নামকরণ হয় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস"।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নতুন বাস্তবতায় তমদ্দুন মজলিস কেবল বাংলা ভাষায়ই নয়, বরং একটা সার্বিক জীবন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ভাষায় একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলো।

"এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাশেমের ইচ্ছে ছিল সব ধারার প্রতিনিধিত্ব রেখে তমদ্দুন মজলিস গঠন করবেন। সেভাবে শুরুও হয়েছিলো। কিন্তু পরে রাজনৈতিক নানা উত্থান পতনের ঘটনায় সংগঠনটি সেভাবে আর টিকে থাকতে পারেনি। এর সদস্যরাও বিভিন্ন সংগঠন কিংবা দলে ছড়িয়ে গিয়েছিলেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম ভাষা আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। এখন তিনি তমদ্দুন মজলিস নিয়ে গবেষণা করছেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ১৯৪৮ ও ৫২ সালে, অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের দুই পর্বেই তমদ্দুন মজলিসের জোরালো ভূমিকা ছিল।

"অবশ্য আটচল্লিশের পর যখন ভাষা আন্দোলন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যুক্ত হতে শুরু করে তখন সারা দেশে তাদের সংগঠন থাকার কারণে তারাই বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাই বলা যায় আটচল্লিশে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় যে ভূমিকা তমদ্দুন মজলিস রাখতে পেরেছিলো ১৯৫২ সালে এসে রাজপথে সেটি তারা পারেনি," বলছিলেন তিনি।

বাংলাপিডিয়া বলছে, তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠায় অধ্যাপক আবুল কাশেমের অগ্রণী সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক এ. এস. এম নূরুল হক ভূঁইয়া, শাহেদ আলী, আব্দুল গফুর, বদরুদ্দীন উমর, হাসান ইকবাল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ফজলুর রহমান ভুঁইয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী।

ভাষা আন্দোলনে যারা সক্রিয় সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী ছিলেন তাদের অনেকের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক "ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ" বইয়ে ফজলুর রহমান ভুঁইয়া বলেছেন, তিনি আর সৈয়দ নজরুল ইসলামই তমুদ্দন মজলিস নামকরণটা করেছিলেন।

ওই একই বইতে দেয়া সাক্ষাৎকারে আব্দুল গফুর বলেছেন, "ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক সূত্রপাত করেছিলো তৎকালীন সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস"।

সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে তাতে যুক্ত হয়েছিলেন আব্দুল গফুর।

"বাংলাকে পাশ কাটিয়ে উর্দু প্রতিষ্ঠার একটা চক্রান্ত চলছে। তখনই তারা চিন্তা করলেন এটা তো ঠিক হবে না। আমাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য।"

"তখন ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর মানে, অর্গানাইজেশনটা প্রতিষ্ঠার দুই সপ্তাহের মধ্যে একটা বই বের করলে 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা- বাংলা না উর্দু'- এই নামে। এতে তিনটা আর্টিকেল ছিল," সাক্ষাতকারে বলেছেন মি.গফুর।

মূলত ওই বইতে অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল মনসুর আহমেদ – এই তিনজনের তিনটি লেখায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করা হলে কী ক্ষতি হবে সেটা তুলে ধরা হয়।

একই সঙ্গে বাংলা ভাষা আন্দোলনে সবাই যাতে অংশ নেয় সেই আহ্বানও জানানো হয়।

তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বেই ১৯৪৭ সালের পহেলা অক্টোবর প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকটায় অধ্যাপক আবুল কাশেমই ছিলেন এর মধ্যমণি।

পরে ১৯৪৮ সালের দোসরা মার্চ তমদ্দুন মজলিশসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের যৌথসভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ' নামে নতুন কমিটি হয়েছিলো।

বাংলাপিডিয়াতেও বলা হয়েছে যে "ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বস্তুত তমদ্দুন মজলিসই প্রথম প্রতিবাদ উত্থাপন করে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ ভাষা আন্দোলনের সূচনায় পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়"।

অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলছেন তমদ্দুন মজলিসকে শুধু তখনকার ঘটনায় বিশ্লেষণ করলে হবে না, বরং একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। ব্রিটিশ আমল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় একে বিচার করতে হবে।

তার মতে, ইংরেজদের সময়ে বাঙালি মুসলিম সমাজ পিছিয়ে ছিল। ওয়াজেদ আলী, লুৎফর রহমান, কাজী আব্দুল ওয়াদুদ ও কাজী মোতাহের হোসেনসহ মুসলিম লেখকদের মধ্যে অনেকে এসব নিয়ে অনেক চিন্তা করতেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান পরেই আবুল কাশেম ও কাজী মোতাহের হোসেনসহ অনেকে সক্রিয় হন।

"আবুল কাশেমের দূরদৃষ্টি ছিল। সংগঠন করার সামর্থ্য ছিল। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল। তারা বিভিন্ন ধারার লোক নিয়ে বৈঠক করেছেন। তারা ভেবেছেন মানুষের মনের দিক চিন্তা করে কিছু কাজ করতে হবে। এক কথায় সবাই চেয়েছেন রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার," বলছিলেন মি. হক।

তিনি বলেন, "তবে পরে আর রাজনৈতিক উত্থান-পতনে তমদ্দুন আর সেভাবে টিকে থাকতে পারেনি। তমুদ্দন মজলিস সদস্যরা বিভিন্ন আদর্শে আলাদা হয়ে যান। কেউ কেউ স্বাধীন বাংলাদেশের যে মুক্তিযুদ্ধ তার বিরোধিতাও করেছেন"।

বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, "... এখানেই তমদ্দুন মজলিসের বিরাট সাফল্য যে, এই সংগঠন অত্যন্ত সফলভাবে দীর্ঘ পাঁচ বছর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সামাজিক প্রত্যয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে এর সাথে সম্পৃক্ত করে ভাষা আন্দোলনকে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেছে।"

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িত অনেকেই আটক হন। এর কার্যালয় ও মুখপাত্র সৈনিক পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনা হয়। সংগঠকদের অনেকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হন।

অর্থাৎ রাজপথের আন্দোলনে আর খুব বেশি টিকতে পারেনি তমুদ্দন মজলিস।

তবে এরপরেও দীর্ঘকাল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রেখেছিলো সংগঠনটি। ১৯৯১ সালে অধ্যাপক আবুল কাশেম মারা গেলে সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুল গফুর মজলিশ।

আর প্রায় আজীবন সভাপতি দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯৯৯ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছেন।