News update
  • Govt Reviewing 101 MoUs, Agreements Signed With India     |     
  • Xi Visits India After Seven Years, Seeks to Reset Ties     |     
  • Flour, aromatic rice prices spike as edible oil crisis persists in Dhaka     |     
  • Dry Monsoon in South Asia: Looming Fears of Agricultural Loss     |     
  • Flood-ravaged Nepal calls for climate justice     |     

'নাইন ইলেভেন'- যে দিনের পর বদলে গেছে মুসলিমদের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক

বিবিসি নিউজ বাংলা সংঘাত 2026-09-11, 6:12pm

rtyert43532-360cb93a74d08d6788bcb5f86feb0f9f1789128737.jpg




'নাইন ইলেভেন' শব্দ দুটি গত ২৫ বছরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের, সব ভাষায় এতো বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে প্রায় যে কোনো অঞ্চলে এটি বলা হলে মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার স্মৃতিই উঠে আসে।

সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ, মঙ্গলবার, সাল ২০০১ – যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুই ভবনে ১৭ মিনিটের ব্যবধানে দুইটি বিমান আঘাত করার ঘটনা চিরতরে বদলে দেয় মুসলিম সংগঠন ও নেতৃত্বের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি।

যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য ইসলামিক চরমপন্থি গোষ্ঠী আল কায়েদা ও তাদের প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে পরের মাসেই আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের 'ওয়ার অন টেরর' বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রথম ধাপ ছিল সেই অভিযান।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন, ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালায় মার্কিন বাহিনী।

নাইন ইলেভেনের হামলার পর ২০শে সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তার ভাষণে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে 'ওয়ার অন টেরর' পরিভাষা ব্যবহার করেন।

সেই ভাষণে 'সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' ঘোষণা করার সময় বাকি বিশ্বের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন "আইদার ইউ আর উইথ আস, অর উইথ দেম", অর্থাৎ এই যুদ্ধে আপনি হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অথবা সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সহ শীর্ষ কর্মকর্তারা যদিও নাইন ইলেভেনের পর থেকে সবসময়ই বলে এসেছেন যে তাদের এসব অভিযান কোনো ধর্ম বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে।

সেদিন বিশ্বের সব দেশের সব নিউজ চ্যানেলে দিনভর সম্প্রচার করা হয় একটিই খবর, কারণ আমেরিকার ভূখণ্ডে হামলা হওয়ার মত বড় খবর সেদিন আর কিছু ছিল না।

কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চলাকালীন ১৯৪১ সালে জাপানি বিমানবাহিনী হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে আমেরিকান নৌঘাঁটিতে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে কখনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।

তবে পার্ল হারবারে হামলার সঙ্গে নাইন ইলেভেনের হামলার ঠিক তুলনা চলে না। কারণ পার্ল হারবারে হামলার সময় আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, আর হামলাটিও হয়েছিল আমেরিকার নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে।

আর ২০০১ এর সেপ্টেম্বরে হামলা করা হয় এমন কিছু স্থাপনায় যেগুলো ছিল হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের কর্মস্থল।

হতাহতের সংখ্যার হিসেবেও পার্ল হারবারকে ছাড়িয়ে যায় নাইন ইলেভেনের হামলাগুলো। পার্ল হারবার হামলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার, আর নাইন ইলেভেনে চারটি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায় প্রায় তিন হাজার মানুষ।

৯/৯৯ হামলার পর সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়রও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই বিষয়ের ওপর জোর দেন যে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর থেকে পার্ল হারবারের সময় একবারই আমেরিকার মাটিতে আঘাত হয়েছিল।

তাই নাইন ইলেভেনের হামলাকে আমেরিকা স্বাভাবিকভাবেই অন্য যে কোনো ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

যেভাবে জানা যায় হামলার খবর

১১ই সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আমেরিকান সময় সকালে ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৬৭ জাতীয় বিমান ১১০ তলা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবনের ৯০ তলার কাছাকাছি অংশে বিধ্বস্ত হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে মনে করা হয় যে এটি বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা। এমনকি সংবাদমাধ্যমগুলো সহ ঘটনাস্থলে থাকা মানুষের অনেকে শুরুতে বুঝতেই পারেনি যে ভবনের ভেতরে বিশাল আকৃতির একটি বিমান আঘাত করেছে।

কিন্তু এটি যে নিছক দুর্ঘটনা নয় তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় ঠিক ১৭ মিনিট পর। যখন আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ পাশের ১১০ তলা ভবনে আঘাত করে।

এই দ্বিতীয় বিমানের আঘাতের লাইভ ভিডিও ধরা পড়ে একাধিক টিভি ক্যামেরায়, কারণ প্রথম আঘাতের পর আমেরিকার প্রায় সব নিউজ চ্যানেলই ক্যামেরা তাক করে রেখেছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে।

দ্বিতীয় বিমান হামলার পর সবাই নিশ্চিত হয়ে যায় যে এই হামলা পরিকল্পিত।মঙ্গলবার সকালে ওই বিমানদুটির বোস্টন বিমানবন্দর থেকে লস অ্যাঞ্জেলসের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। দুটি বিমানেই পাঁচজন করে হাইজ্যাকার ছিল, যারা বিমান উড্ডয়নের পর সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এবং দিক পরিবর্তন করে নিউ ইয়র্কের দিকে নিয়ে যান।

পরে জানা যায় একই সময়ে আরো দুটি বিমান হাইজ্যাক করা হয় যেগুলো ওয়াশিংটনের উদ্দেশে যাচ্ছিল। ওই বিমানগুলো ক্যাপিটল হিলে আর পেন্টাগনে আঘাত করার উদ্দেশে যাচ্ছিল।

ওই দুটি বিমানও বিধ্বস্ত হয়ে দুইশোর বেশি মানুষ মারা যায়।হামলার পেছনে কারা দায়ী, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু না বলা হলেও পরদিন থেকেই মার্কিন গণমাধ্যম আর কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে আল কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের সম্পৃক্ততার বিষয় তুলে ধরতে শুরু করেন।

ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা মুসলিম বিশ্বে সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দায়ী করত। ধারণা করা হয়, গোষ্ঠীটির খালিদ শেখ মোহাম্মদ, যার জন্ম, কুয়েতে, তিনি এই পরিকল্পনার মূল রূপকার ছিলেন এবং তিনি পাইলটদের নিয়োগে সহায়তা করেছিলেন।

মোট ১৯ জন ব্যক্তি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে ১৫ জন ছিলেন বিন লাদেনের মতোই সৌদি নাগরিক; দুজন ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের, একজন মিসরের এবং একজন লেবাননের নাগরিক।যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আল কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনকে এই ঘটনার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন ঘটনার ৯ দিন পর, ২০শে সেপ্টেম্বর।

জর্জ ড্বলিউ বুশ জুনিয়ার সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে 'ওয়ার অন টেরর' বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

তার সেদিনের বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, "সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ আল কায়েদার বিরুদ্ধে শুরু হচ্ছে, কিন্তু বৈশ্বিক ব্যপ্তিসম্পন্ন প্রতিটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে খুঁজে বের করে প্রতিহত করার আগ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে।"

আমেরিকা ও মুসলিমরা যেভাবে মুখোমুখি

২০শে সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট বুশ আনুষ্ঠানিকভাবে আল কায়েদা আর ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুললেও বিন লাদেন তার কয়েক বছর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার 'মোস্ট ওয়ান্টেড' তালিকায় ছিলেন।

ওসামা বিন লাদেন ১৯৯৮ সালে কেনিয়া আর তানজানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে আত্মঘাতী বোমা হামলার অভিযুক্ত মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। পরে ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে আমেরিকান নৌবাহিনীর একটি জাহাজেও আত্মঘাতী বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ওসামা বিন লাদেনের তৈরি করা সংগঠন আল কায়েদাকে দায়ী করা হয়।

ওসামা বিন লাদেন নিজেও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যে আমেরিকার সেনাসদস্যদের হত্যার কথা বলেছেন।

তাই নাইন ইলেভেন হামলার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে যখন অভিযুক্ত করা হয়, সেটি অনেকটা অনুমেয়ই ছিল।

কিন্তু আফগানিস্তানের তৎকালীন তালেবান সরকারের কাছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেনসহ আফগানিস্তানে থাকা আল কায়েদার নেতাদের তাদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানায়, তখন তৎকালীন তালেবান প্রধান মোল্লা ওমর তা নাকচ করে দেন।

আর সেই ধারাবহিকতায় ২০০১ সালের অক্টোবরের সাত তারিখ আফগানিস্তানে 'অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম' শুরু করে মার্কিন বাহিনী।

ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে থাকা আল কায়েদার গোপন ঘাঁটি ধ্বংস করা।

এর দুই বছর পর, ২০০৩ সালে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইরাকেও আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই অভিযান বিশ্বের অনেক দেশের মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনেক মুসলিম দেশের মানুষের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল। কিন্তু আফগানিস্তান আর ইরাকে সামরিক অভিযান সেই ক্ষোভকে আরো উসকে দেয়।

আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর আগে থেকেই পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ র‍্যালি করতে দেখা যায় মানুষকে। অনেক জায়গাতেই ওসামা বিন লাদেনকে 'নাইন ইলেভেন' হামলার জন্য 'বীর' হিসেবে দাবি করে প্রশংসা করতেও দেখা যায়।

এরপর আফগানিস্তানে যখন পুরোদস্তুর সামরিক অভিযান শুরু হয়, তখন তুরস্ক, মিশর, ইয়েমেন, পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও ইতালি, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতেও মার্কিন আগ্রাসন-বিরোধী র‍্যালি হয়।

এরপর ২০১১ সালে লিবিয়ায় মার্কিন বাহিনীর অভিযানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র হয়।

মুসলিম দেশগুলোর বহু মানুষের মধ্যে যেমন আমেরিকার এসব অভিযানের কারণে বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তেমনি আমেরিকার মানুষের মধ্যেও ইসলামবিদ্বেষী চিন্তাধারা তীব্র হয়েছে নাইন ইলেভেন হামলার পর থেকে।

নাইন ইলেভেন হামলার পরদিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী হামলার খবর পাওয়া যেতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে ওই ঘটনার আগেও যে মুসলিমবিদ্বেষ ছিল না, তা নয়। কিন্তু নাইন ইলেভেন হামলার পর থেকে সেসব ঘটনা সংখ্যায় ও তীব্রতায় বহুগুণে বেড়েছে।

যেমন এফবিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বষী 'হেইট ক্রাইম' বা ঘৃণাসূচক হামলার সংখ্যা ছিল ২৮টি। ১৯৯৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২।

কিন্তু ২০০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১তে, যার প্রায় ৮০ ভাগের বেশি হয় ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পর।

এরপর থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় কোনো বছরই এই সংখ্যাটা ১০০'র নিচে নামেনি।