জ্বালানি দক্ষ পণ্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে ত্রিপক্ষীয় আস্থা সৃষ্টি জরুরি

2021-10-16, 11:02pm error

screenshot-713-1822458096f0e3c78cb2b7aaa13961751634403774.png

Screenshot (713)

ঢাকা, অক্টোবর ১৬, ২০২১: জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে কার্বন দুষণ নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য অর্জনে মানসম্মত বৈদুতিক অ্যাপলায়েন্স ব্যবহার করার কোনো বিকল্প নেই। কেননা কেবলমাত্র আবাসিক খাতেই ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় যার বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব এর দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে। এর জন্য ভোক্তা, উৎপাদন ও সরকার এই ত্রিপক্ষীয় আস্থা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। স্রেডা, বিএসটিআই ও অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ডকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে মান চূড়ান্তকরণ ও স্টার লেবেলিং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কেবল দেশে উৎপাদিত পণ্য নয়, আমদানিকৃত পণ্য নির্ধারিত মান ছাড়া দেশীয় বাজারে বিপণন নিষিদ্ধ করতে হবে। নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধসহ গ্রেমার্কেট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিএসটিআইকে মনিটরিং অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের জনবল বৃদ্ধি ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড প্রোডাক্টস লেবেলিং শীর্ষক ইপি টকসে বিশেষজ্ঞরা উপরের মতামত তুলে ধরেছেন।

স্রেডা ও জিআইজেডের সহায়তায় এনার্জি এন্ড পাওয়ার আয়োজিত এই টকস সঞ্চালনা করেন ইপি সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে যুক্ত ছিলেন সাসটেনেবল অ্যান্ড রিনিয়েবল এনার্জি ডেভলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব জনাব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। গেস্ট অব অনার ছিলেন ড্যাফডিল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এবং কজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম মোস্তফা কামাল। আলোচ্য বিষয়ের উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইউটিটিউটের স্টান্ডার্ড বিভাগের উপপরিচালক মিসেস রহিমা তালুকদার। প্যানেলিস্ট হিসাবে যুক্ত ছিলেন এনার্জিপ্যাক ইলেক্টনিক্স-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আকতার, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চিফ বিজনেস অফিসার জনাব আনিসুর রহমান মল্লিক, ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মোহাম্মদ সাহেরুল আজম এবং জিআইজেড এর আইইইপি ২ প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার আল মুদাবির বিন আনাম।

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার অর্জন দ্বিগুণ করার জন্য স্রেডা এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশন রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার যে কার্বন দুষণ রোধে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জনে এর পুরোপুরি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

এরজন্য বাতি, ফ্যান, এসি, ফ্রিজ এর মতো পণ্যের মান নির্ধারণ এবং লেবেলিং এর মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা দরকার। স্রেডা এটার জন্য প্রবিধানের খসড়া চূড়ান্ত করেছে এবং তা বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আমরা ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেডের কারখানায় এনার্জি অডিট করে জেনেছি তাদের এলইডি বাতি আন্তর্জাতিক মানের। সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পণ্যে স্টার লেবেলিং করার পাশাপাশি আমদানি পণ্যেও জন্যও এটা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে বিএসটিআই তাদের মান নির্ধারণ করা পণ্যে লেবেলে কিউআর কোড চালু করতে যাচ্ছে। যাতে কেনার সময় যেকোনো ভাক্তা সেল ফোনের মাধ্যমে স্ক্যান করে মান যাচাই করে নিতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, স্রেডা এককভাবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। সম্মিলিতভাবে সকল পক্ষ মিলে জনসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। আমরা আশা করি স্রেডা আগামী দিনে ভোক্তাদের সকল চাহিদার পক্ষে পুরোপুরি কাজ করতে সক্ষম হবে।

ক্যাব এর জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারের জন্য পণ্যমান নিশ্চিত করতে হলে কেবলমাত্র ভোক্তাদের সচেতন করলে হবে নাÑ নীতি নির্ধারক ও বাস্তবায়নকারী সকলকে সচেতন করতে হবে। তিনি সরকারি টাকায় নিম্নমানের সিএফএল বাতি কেনার সমালোচনা করে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন। তিনি মনে করেন, স্রেডাকে কেবল দায়িত্ব দিলেই হবে না কাজের জন্য আইন প্রণয়ন করে স্রেডাকে স্বাধীন রেগুলেটর বানাতে হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম মোস্তফা কামাল বলেন, ইনক্যানডোসেন্ট বাল্ব থেকে সিএফএল, টিউব লাইট হয়ে এখন এলইডি বাল্ব এসেছে। আলো বেশি, দাম কম এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়ায় এমনিতেই জনপ্রিয় হয়েছে। এছাড়া এলইডি বাল্ব টেকেও অনেক বেশি। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য চিহ্নিত করতে স্টার দেয়া হয়। চীন, মালয়শিয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য ব্যবহারে তাৎক্ষণিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। ধরা যাক কেউ একটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রাইস কুকার কিনলেন তিনি তাৎক্ষণিক ৫০০ টাকা দাম কম দিবেন।

বিক্রেতা পরে সরকারের কাছ থেকে এ অর্থ পেয়ে যাবেন। আমাদের তেমনিভাবে মানুষকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এছাড়া বাজারে থাকা পণ্যগুলো কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে।

এনার্জিপ্যাক ইলেক্ট্রনিকসের সিইও ও পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আকতার বলেন, স্থানীয় উৎপাদকের মানসম্মত পণ্য নকল হচ্ছে যা উদ্বেগজনক। এছাড়া আমদানি পর্যায়ে মান নিয়ে তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। আমদানিকারক যেন মানসম্মত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য আনতে বাধ্য হয় তেমন ব্যবস্থা করতে হবে।

এছাড়া আমদানি করা পণ্য পরীক্ষার সময় কমাতে হবে। মানসম্মত উৎপাদন সনদ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলি বাজারে দেওয়া সব পণ্য মান ঠিক রেখে সরবরাহ করছে কি না তা দেখা দরকার। এখানে উল্লেখ করা যায়, ভারতে সবাই ৪৮ ইঞ্চি ফ্যান ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের এখানে ৫৬ ইঞ্চির ফ্যান বহুল ব্যবহৃত। প্রাচীন পদ্ধতির ব্যালাস্ট, সিএফএল ব্যবহার একবারেই বন্ধ করতে হবে। তাহলে অপচয় বন্ধ হবে। এগুলো অর্জন করার জন্য ভোক্তা, উৎপাদন ও সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডিস্টিজের চিফ বিজনেস অফিসার আনিসুর রহমান মল্লিক বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে ওয়ালটনের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

ফ্রিজারের ক্ষেত্রে এফিশিয়েন্ট কমপ্রেশার ব্যবহার হচ্ছে। এসি তে এমন ইনভার্টার ব্যবহার পরিকল্পনা হচ্ছে যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ করে। ১২-১৬ ওয়াটের সোলার ফ্যান বাজরে আনতে যাচ্ছে ওয়ালটন।

ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মোহাম্মদ সাহেরুল আজম বলেন, আমরা মানসম্মত এলইডি বাল্ব এবং টিউব বিএসটিআই নির্ধারিত মান অনুযায়ী উৎপাদন করে যাচ্ছি। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য উৎপাদনে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।

জিআইজেড আইইইইপি ২ এর প্রোগ্রাম কো-অডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার আল মুদাবির বিন আনাম বলেন, মানদ- সকলের মতামতের ভিত্তিতেই হতে হবে। আবার এটা বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে, এফিশিয়েন্ট পণ্য ব্যবহার করলে কম খরচে বেশি সেবা পাব। অপচয় এবং এনার্জির ব্যবহার কমবে। এনার্জি এফিশিয়েন্ট পণ্যের সরকার, বেসরকারি খাত এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে হবে। বাজারে চালু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্যগুলো কতটুকু মানসম্মত তা পর্যালোচনা করা দরকার। তিনি বলেন, মানসম্মত ল্যাব গড়ে তোলার বিষয়াটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসটিআই এর উপপরিচালক মিসেস রহিমা তালুকদার। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এনার্জি স্টার মানদ- ঠিক করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এনার্জি এফিশিয়েন্সি অনুযায়ী স্টার রেটিং দেওয়া হবে।

বিএসটিআই এর সহকারী পরিচালক আরাফাত হোসেন সরকার বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী পণ্য আমদানি নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যত্রাংশ এবং পুরো পণ্য দুভাবেই আমদানি হয়। এনবিআরের তৎপরতা এখানে জরুরি। এক মাসের মধ্যে বিএসটিআই পণ্যের মান নির্ণয়ে কিউআর কোড প্রবর্তন করতে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গ্রাহক জানতে পারবে পণ্যটি মানসম্মত কি না।

স্রেডার সদস্য ফারজানা মততাজ বলেন, কোন মানের পণ্যকে জ্বালানি দক্ষ বলা হবে তা বিএসটিআই নির্ধারণ করলেও স্টার লেবেলিং এর কাজ করবে স্রেডা। - ইপি টকস