
সরু একফালি চাঁদ। তার ঠিক পাশেই উজ্জ্বল একটি আলোকবিন্দু। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার পশ্চিম আকাশে এমন দৃশ্য দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়িয়েছেন।
কেউ কেউ ভেবেছেন, চাঁদের পাশে বুঝি কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে। আসলে সেটি নক্ষত্র নয়, সৌরজগতের অন্যতম উজ্জ্বল গ্রহ শুক্র।
চাঁদ ও শুক্রের এই কাছাকাছি অবস্থানকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘চাঁদ-শুক্র সংযোগ’ বা মুন-ভেনাস কনজাংশন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট ইন দ্য স্কাই-এর তথ্য অনুযায়ী, এদিন পৃথিবী থেকে দেখা হিসাবে চাঁদ ও শুক্রের কৌণিক দূরত্ব ছিল প্রায় ৩১ আর্কমিনিট। সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানের সময় এই ব্যবধান কমে প্রায় ২৮ দশমিক ৮ আর্কমিনিটে নেমে আসে।
এর ফলে পৃথিবী থেকে তাকালে মনে হয়, চাঁদ ও শুক্র যেন পাশাপাশি অবস্থান করছে। তবে বাস্তবে তাদের মধ্যে দূরত্ব বিপুল। এটি মূলত পৃথিবী থেকে দেখা একটি আপাত নৈকট্য।
অন্ধকার আকাশে চাঁদের বাঁকা আলোকিত অংশটি যেমন স্পষ্ট ছিল, তেমনি তার পাশে শুক্রের উজ্জ্বলতাও সহজেই চোখে পড়েছে।
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডারগুলোর হিসাবে, এ সময় চাঁদের উজ্জ্বলতা ছিল প্রায় মাইনাস ১০ দশমিক ৩ ম্যাগনিটিউড এবং শুক্রের প্রায় মাইনাস ৪ দশমিক ৫ ম্যাগনিটিউড। ম্যাগনিটিউডের ক্ষেত্রে সংখ্যা যত ঋণাত্মক হয়, জ্যোতিষ্ক তত উজ্জ্বল বলে বিবেচিত হয়।
শুক্র এত উজ্জ্বল যে অনেক সময় একে নক্ষত্র বলে ভুল করেন অনেকে। প্রচলিত নাম ‘সন্ধ্যাতারা’ বা ‘ভোরের তারা’ হলেও শুক্র আসলে একটি গ্রহ। সূর্যের আলো শুক্রের ঘন মেঘমণ্ডল থেকে প্রতিফলিত হওয়ার কারণে গ্রহটি পৃথিবীর আকাশে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখা যায়।
সোমবারের মহাজাগতিক ঘটনার আরেকটি দিক ছিল লুনার অকাল্টেশন বা চন্দ্রআবরণ।
ইন দ্য স্কাই-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কিছু অঞ্চল থেকে এদিন চাঁদের আড়ালে শুক্রকে সাময়িকভাবে চলে যেতে দেখা সম্ভব ছিল।
পৃথিবী থেকে দেখার দৃষ্টিরেখায় চাঁদ যখন শুক্রের সামনে চলে আসে, তখন কিছুসময়ের জন্য শুক্রকে আড়াল করে। তবে এ ঘটনা পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে দেখা যায় না। পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কোথাও শুক্র চাঁদের আড়ালে যায়, আবার কোথাও দুটিকে পাশাপাশি দেখা যায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সোমবার সন্ধ্যার দৃশ্যটি ছিল মূলত সরু চাঁদের পাশে উজ্জ্বল শুক্রের উপস্থিতি। পশ্চিম দিগন্ত পরিষ্কার থাকায় কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে খালি চোখেই দৃশ্যটি দেখতে পেয়েছেন।
কক্সবাজারের উখিয়ার ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সোহেল চৌধুরী অনুরূপ দৃশ্যের কিছু ছবি মুঠোফোনে ধারণ করে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করেন।
তিনি জানান, ' এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা পাওয়া যায় না, প্রকৃতির নান্দনিকতা আসলেই বিস্ময়কর। '
ফিলিপাইনের সরকারি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আবহাওয়া সংস্থা পাগাসার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ডায়েরিতেও ১৪ সেপ্টেম্বর চাঁদ ও শুক্রের সংযোগের উল্লেখ রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে তাদের সংযোগ ঘটে এবং সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে তারা সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছায়।
সেপ্টেম্বর মাসে শুক্র পর্যবেক্ষণের জন্য আরও কয়েকটি ভালো সুযোগ রয়েছে। নাসার সেপ্টেম্বরের আকাশ পর্যবেক্ষণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, মাসের মাঝামাঝি সময়ে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে শুক্র অত্যন্ত উজ্জ্বল থাকবে। ১৮ সেপ্টেম্বরের দিকে গ্রহটি সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে নাসা জানিয়েছে। অন্যদিকে পাগাসার হিসাবে ২৩ সেপ্টেম্বর শুক্রের ‘গ্রেটেস্ট ব্রাইটনেস’ বা সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার সময়।
তারিখে সামান্য পার্থক্য থাকলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত শুক্র পর্যবেক্ষণের জন্য সময়টি আকর্ষণীয়। মাসের শেষ দিকে গ্রহটি সূর্যের দিকে নিচু অবস্থানে চলে যাওয়ায় সন্ধ্যার আকাশে তাকে দেখা তুলনামূলক কঠিন হবে।
এ মাসে চাঁদকে ঘিরেও রয়েছে আরও কিছু মহাজাগতিক ঘটনা। ১৯ সেপ্টেম্বর রয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল অবজার্ভ দ্য মুন নাইট’ বা আন্তর্জাতিক চন্দ্র পর্যবেক্ষণ রাত। ২৭ সেপ্টেম্বর চাঁদ ও শনির কাছাকাছি অবস্থানও আকাশপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরি করতে পারে। ২৬ সেপ্টেম্বরের পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়ে দেখা যাবে ‘হারভেস্ট মুন’ বা ফসলের চাঁদ।