
লাল শাপলা পুকুরের পাড়ে, সারি সারি বড় গাছের ছায়া। গাছের শীতল ছায়া আর পুকুরের জলে ভেসে আছে শাপলার সৌন্দর্য—এমন এক মনোরম পরিবেশে প্রকৃতির এত কাছাকাছি থেকে তিনপায়ার স্ট্যান্ডে বাঁধানো ড্রয়িং বোর্ডে তুলির আঁচড় আর রঙের ছোঁয়ায় তারা সৃষ্টি করছেন একের পর এক নজরকাড়া শিল্পকর্ম।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অন্যান্য ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা যখন বই-খাতা আর অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত, তখন ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা প্রাকৃতিক পরিবেশে ছবি আঁকার জন্য ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত চত্বর ও লেকপাড়ে জড়ো হন।
ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা স্কুলের অধীনে, যেটি কাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নিচে অবস্থিত। খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতায় ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষে চারুকলা ইনস্টিটিউট হিসেবে পথচলা শুরু হয়। খুলনাঞ্চলের খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী শশীভূষণ পালের শিল্পভাবনা এবং এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারা খুবি চারুকলার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
তবে এ ডিসিপ্লিনের পড়াশোনাটাই আসলে এই পরিবেশকে ঘিরে। চার দেয়ালের মাঝে থেকে তাদের চারুকলার পড়াশোনাটা সম্ভব না। অবশ্যই একটা সুন্দর পরিবেশ তাদের কাজ ও চিন্তাভাবনাকে সুন্দর করে তোলে। বিশেষ করে লাল শাপলা পুকুরের এই শান্ত পরিবেশ শিক্ষার্থীদের প্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দিচ্ছে।
গাছের শীতল ছায়া, পানিতে ভেসে থাকা শাপলা এবং চারপাশের নীরবতা শিক্ষার্থীদের মনকে অনেক বেশি স্থির করে। ফলে তারা ছবি আঁকার সময় প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিজের মতো করে অনুভব ও ক্যানভাসে প্রকাশ করতে পারেন।
ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা জানান, চার দেয়ালের মধ্যে কৃত্রিম আলো অনেকটা নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু বাইরে প্রকৃতির আলো সবসময় পরিবর্তিত হয়। সূর্যের আলো, গাছের ছায়া, পানির প্রতিফলন—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতিতে আলো ও ছায়ার বৈচিত্র্য অনেক বেশি দেখা যায়। সরাসরি প্রকৃতির মধ্যে বসে আঁকার ফলে তারা এই পরিবর্তনগুলোকে বাস্তবভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী প্রীতম দত্ত। তার স্বপ্ন এক সময় দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী হবেন। আর এ স্বপ্ন পূরণের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিয়াম নামের এক শিক্ষার্থী এই পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশটাকেই তার ছবির বিষয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে পানির মধ্যে ভেসে থাকা লাল শাপলা, গাছের সবুজ এবং আলো-ছায়ার যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটাই তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে।
তিনি বলেন, একজন উদীয়মান শিল্পী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমার ভবিষ্যৎ শিল্পভাবনায় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। প্রকৃতির কাছাকাছি এসে কাজ করার মাধ্যমে আমি শুধু দৃশ্য আঁকছি না, বরং প্রকৃতির আলো, রঙ, পরিবেশ ও অনুভূতিকে বুঝতে শিখছি। ভবিষ্যতে আমার কাজের মধ্যে প্রকৃতির এই সরলতা, শান্তি এবং বাস্তব অনুভূতিগুলো আরও বেশি করে তুলে ধরতে চাই।
সিয়ামের সহপাঠী রিতু রহমান বলেন, পুকুরের লাল শাপলা আমাকে উজ্জ্বল লাল রঙ ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করছে, আর চারপাশের গাছপালার সবুজ রঙ ছবিতে একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য তৈরি করছে। পানির নীলাভ ও মাটির বিভিন্ন টোনও ছবির রঙের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
অর্থাৎ আমি কৃত্রিমভাবে রঙ বেছে নেওয়ার চেয়ে প্রকৃতির মধ্য থেকেই রঙের অনুপ্রেরণা নিচ্ছি।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, এমন নান্দনিক পরিবেশে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি আঁকছেন, বিষয়টা সত্যিই আসাধারণ। তাদের একসঙ্গে বসে গল্প, আড্ডা, ছবি আঁকা- সব মিলিয়ে বিষয়টি দারুণ।
উল্লেখ্য, দেয়ালচিত্র, গ্রাফিতি, পহেলা বৈশাখসহ অন্যান্য উৎসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা তাদের শৈল্পিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন। বিশেষ করে বর্ষবরণ উৎসবের মূল আকর্ষণ—বিশাল মঙ্গল শোভাযাত্রার শিল্পসামগ্রী, আলপনা, মুখোশ ও সুসজ্জিত মোটিফ তৈরিতে এই ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দেন।
এছাড়াও ক্যাম্পাস এবং খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক সচেতনতামূলক ও ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতায় গ্রাফিতি এবং দেয়ালচিত্র আঁকায় রাখেন অনন্য ভূমিকা।