
১৭ বছর আগে মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকেই যাত্রাটা শুরু করেছিলেন রুবেল হোসেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ক্রান্তিলগ্নেও মুখোমুখি সেই মিরপুর স্টেডিয়ামের। একটু আবেগপ্রবণ তো হওয়াই স্বাভাবিক। তবে একটু না, রুবেল আবেগপ্রবণ হলেন অনেকটাই। কান্নাটা কোনোভাবে আটকে রাখলেও কথা বলতে গিয়ে জড়িয়ে যাওয়া এবং শব্দ ভেঙে যাওয়াটা নজর এড়ায়নি কারোরই। চিরাচরিত আগ্রাসী রুবেলকে দেখে অভ্যস্ত সমর্থকরা যেন আজ দেখলেন তারই পুরোপুরি ভিন্ন একটি রূপ। আবেগে ভেসে-ভাসিয়ে বিদায় বললেন জাতীয় দলের জার্সিকে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের মাঠ থেকে বিদায়ের রীতিটা আগে-পরে খুব একটা দেখা যায়নি। তাই রুবেলের বিদায় নিয়ে সবার মধ্যেই একটু কৌতূহল ছিল, বিশেষ কী হতে যাচ্ছে এইবার। তবে সব আয়োজন ছাপিয়ে রুবেলের আবেগটাই নজরে এলো সবার।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রুবেল খেলছেন না বছর পাঁচেক ধরেই। গত বুধবার ৩৬ বছর বয়সি পেসার সামাজিক মাধ্যমে বিদায়ের ঘোষণা দেন আনুষ্ঠানিকভাবে। আজ (২০ এপ্রিল) বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচের আগে ছোট্ট এক আয়োজনে রুবেলকে সম্মান জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
বিদায়ের দিনটায় রুবেল যেন ফিরে গেলেন স্মৃতির পুরোনো লেনে। সকালেই ছেলে আয়ানকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন। টসের পর ছেলেকে নিয়েই ঢোকেন মাঠে। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায় তাকে। একটু পর শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।
মাঠের ভেতরে এক কর্নারে দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান ক্রিকেটার এবং সাপোর্ট স্টাফরা। বিসিবির পক্ষ থেকে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবালসহ সদস্য রফিকুল ইসলাম বাবু, ফাহিম সিনহা ও বোর্ডের প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরি ছিলেন এই আয়োজনে।
বিসিবির পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক হিসেবে রুবেলকে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট এবং ফ্রেম বাঁধাই করা তিন সংস্করণের জার্সি। জার্সিতে খোদাই করা ছিল তার বোলিং পরিসংখ্যান।
সম্মাননা স্মারক গ্রহণের পর কথা বলতে গিয়ে বেশ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন রুবেল। তাকে বিদায় দেওয়ার জন্য বিসিবির এমন আয়োজনে সম্মানিত বোধ করছেন বলে জানান তিনি। রুবেল বলেন, ‘আমি যখন অবসর ঘোষণা করি আমার সামাজিক মাধ্যমে, তার পরবর্তী সময়ে আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবাল আমাকে ফোন দিয়ে বলেন যে, ‘‘রুবেল তোকে আমরা সম্মানিত করতে চাই।’’ বিষয়টা আমার কাছে খুবই গর্বের ও আনন্দের ছিল এবং আজকে এত সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি করেছে, এত সুন্দরভাবে আমাকে সম্মানিত করেছে, এজন্য বিসিবি এবং আমাদের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবালকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।’
দেশের ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে রুবেলের উঠে আসা ‘পেসার হান্ট’ প্রতিযোগিতা থেকে। রুবেলকে সেখান থেকে তুলে আনার পেছনে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, বিদায় বেলায় সেই কোচ সরোয়ার ইমরানকেও স্মরণ করেছেন রুবেল, ‘একটি মানুষের কথা না বললেই নয়, আমার আজকের রুবেল হোসেন হওয়ার পেছনে যে মানুষটার অবদান আমার কাছে অন্যরকম। আমাকে পেসার হান্ট থেকে নিয়ে এসে যে মানুষটা আমাকে উপরে ওঠার সিঁড়ি ধরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমার প্রিয় কোচ আমার শ্রদ্ধেয় সরওয়ার ইমরান স্যার। স্যারের প্রতি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।'
নিজের বক্তব্যে রুবেল আরও স্মরণ করেছেন, 'ছোটোবেলা থেকে স্কুল টুর্নামেন্ট থেকে শুরু করে আমার সমস্ত কোচ এবং জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে আমার ফিজিও এবং আমাদের গ্রাউন্ডসকর্মী থেকে শুরু করে সমস্ত কোচদেরকে সবাইকে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই, যারা আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং আমার পাশে ছিলেন।'
বাবা-মার উদ্দেশে বলেন, ‘আজকে এখানে দাঁড়াতে পেরেছি আমার দুইজন মানুষের জন্য, সে হচ্ছে আমার বাবা এবং আমার মা, যারা আমাকে আন্তরিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন, আমার পাশে ছিলেন, আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছেন, আমি তাদেরকে আজকে খুব মিস করছি।'
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রুবেলের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় হাইলাইট ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ। সেই ম্যাচে এই পেসারের দুটো অবিস্মরণীয় বল এখনও অমর হয়ে আছে দেশের ক্রিকেটে। বিদায়ের দিনে রুবেলকে নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে সেই স্মৃতির কথা মনে করলেন তাসকিন আহমেদ।
তাসকিন বলেন, ‘আমার এখনও মনে আছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটা, এমন একটা কঠিন পরিস্থিতি ছিল এবং দুই বলে দুই উইকেট (আসলে তিন বলে) নিয়ে আপনি আমাদেরকে কোয়ালিফাই করতে সাহায্য করেছিলেন। ওই কথাটাই এখনও মনে পড়ে যে, ‘ডোন্ট গো ফর হিরো, গোজ ফর হিরো’, রুবেল হোসেনই জিতিয়েছে ম্যাচটা। অনেক স্মৃতি বার্মিংহামেও আছে, সেটা না বললাম, কিন্তু থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।’
রুবেলের নায়কোচিত বোলিংয়ের কারণেই সেবার ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে পা রাখে বাংলাদেশ। ম্যাচটাতে রুবেল একাই নিয়েছিলেন ৪ উইকেট।
এই সমানসংখ্যক উইকেট রুবেল নিয়েছিলেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেও। এছড়াও ওয়ানডেতে ৪ উইকেট পাওয়ার অভিজ্ঞতা তার সাত বার। রুবেলের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা দুটি বোলিং পারফরম্যান্সই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এবং দুটিই মিরপুরে। সেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে ম্যাচের দিনেই নিলেন বিদায়। আবেগটা যে একটু বেশিই ছুঁয়ে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। সে কারণেই হয়তো সম্মাননা আয়োজন শেষে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে উইকেটের কাছে গেলেন রুবেল। ছুঁয়ে দেখলেন উইকেট। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হয়তো মনে করার চেষ্টা করলেন ক্যারিয়ারের সেই বিশেষ মুহূর্তগুলো।
মাঠের বাইরে পরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার পেছনের কথা জানান রুবেল, ‘একটু ইমোশনাল হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেহেতু ১২-১৩ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি। ভালো-মন্দ মিলিয়ে এই মিরপুর স্টেডিয়ামে আমার অনেক স্মৃতি আছে। স্বাভাবিক একটু ইমোশনাল হওয়ারই কথা। তবে ভালো লেগেছে, আমাকে এত সুন্দরভাবে সম্মানিত করেছে।'
বিদায়ের দিন দেশের ক্রিকেটের দুই কিংবদন্তি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা এবং সাকিব আল হাসানের সঙ্গে স্মৃতি নিয়েও কথা বলেছেন রুবেল। তিনি বলেন, ‘মাশরাফী ভাই খুবই মজার একজন মানুষ। আসলে সে এমন একজন মানুষ, ড্রেসিং রুমে সবসময় জুনিয়র খেলোয়াড় যারা আছে... সমবয়সি যারা আছে, সবার সঙ্গে অনেক ভালো সম্পর্ক রাখেন।’
মাঠে সবসময় মাশরাফীর নির্দেশনা অনুযায়ী খেলতেন বলে জানিয়ে রুবেল বলেন, ‘আমি যতদিন ক্রিকেট খেলেছি, ভাই আমাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে বলেছে, আমি আমার শতভাগ চেষ্টা করেছি।’
অবসরের বিষয়ে সাকিবের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাকিব ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে। আমাকে বলেছেন, ‘‘আরও কয়েকটা দিন খেলতি।’’ আমি তাকে বলেছি, অনেকদিন তো বাইরে (জাতীয় দলের) ছিলাম।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রুবেল তার শেষ ম্যাচ খেলেন ২০২১ সালের এপ্রিলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এবার নিউজিল্যান্ড সিরিজ শুরুর আগেই জানালেন বিদায়। দেশের হয়ে ওয়ানডেতে ১২৯টি, টেস্টে ৩৬টি এবং টি-২০তে ২৮টি উইকেট শিকার করেছেন। টেস্ট ও ওয়ানডে ফরম্যাটে তার একটি করে ইনিংসে পাঁচ উইকেট (ফাইফার) নেয়ার কীর্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে হ্যাটট্রিকসহ ২৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। এখনও যা ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড, যৌথভাবে মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার সঙ্গে।