
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট। তাই সম্মিলিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।
বুধবার (৬ এপ্রিল) বিকেলে কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন মূলত সেখানে চলমান বিভিন্ন সমস্যার বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণের জন্য। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশীয় এনজিওগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, খাদ্য ও নিরাপত্তা; সবকিছুর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করতেই এই সফর।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অতীতে বিএনপি সরকারের সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল।
বর্তমানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং সীমান্ত পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার, আরাকান আর্মিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি চীন, ভারত, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম দেশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি অনেক সময় আড়ালে চলে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-রোহিঙ্গা সংকট এখনও প্রাসঙ্গিক এবং এটি বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। তবে বাংলাদেশ সরকার সবকিছু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যতেও এভাবেই এগিয়ে যাবে।
তিনি জানান, সরকার গঠনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধুমাত্র কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক কোনো একক পদ্ধতিতে সমাধান সম্ভব নয়। এটি একটি জটিল বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সমাধান বহুপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। সে কারণে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নিয়মিত যোগাযোগ ও সংলাপ চলছে, যাতে ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়।
এদিকে, প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থানের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট, শিক্ষার ঘাটতি এবং আশ্রয়ের অভাব দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে আসা প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থানের ব্যবস্থাও এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, পুলিশ, নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা অত্যন্ত সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে- একদিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর আগে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তারও আগে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সরকারের মিয়ানমার উইংয়ের ৫ সদস্য, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।