
SSC examinees at an examination centre
পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চলমান এসএসসি পরীক্ষায় খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে অর্থের বিনিময়ে এক পরীক্ষার্থীকে উত্তর পত্র লিখে সরবরাহের পরও রহস্যজনক কারণে অভিযুক্ত শিক্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। কেবল পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে দুই শিক্ষককে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে কানা ঘুষা চলছে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে। কেউ বলছেন অভিযুক্ত শিক্ষকরা ক্ষমতাসীন দলের পদ পদবী ধারী, আবার কেউ বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ম্যানেজ। তাই তাদের কিছুই হবে না। তবে বরিশাল বোর্ড চেয়ারম্যান বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি'র ডিজিকে অনুরোধপত্র দেয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত দুই শিক্ষক হচ্ছেন খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম ও গণিতের শিক্ষক মেজবা উদ্দিন।
এর আগে গত ৩ মে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে অংক পরীক্ষার দিন নিয়ম বহির্ভূতভাবে সিসি ক্যামেরার বাইরে সিকবেডে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয় হামিম ব্যাপারী নামের এক পরীক্ষার্থীকে। পরে তাকে উত্তর পত্র লিখে সরবরাহ করেন মো. জহিরুল ইসলাম ও মেজবা উদ্দিন নামের দুই শিক্ষক। এদের প্রভাবে কেন্দ্র সচিব ও দায়িত্বরত শিক্ষকরা নিশ্চুপ থাকলেও বোর্ডের ভিজিলেন্স টিমের হাতে লেখা উত্তরপত্রসহ ধরা পড়ে ওই পরীক্ষার্থী। তাৎক্ষণিক পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয় এবং এ নিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসীন সাদেককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন ইউএনও কাউছার হামিদ।
গত ৬ মে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই দুই শিক্ষকের যোগসাজশে হামিমকে প্রশ্নের উত্তরপত্র লিখে সরবরাহ করা হয়েছিল। এমনকি সিসি ক্যামেরাবিহীন ওই কক্ষের মূল দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক শিক্ষক দেবাশীষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে উত্তরপত্র লিখে সরবরাহের প্রমাণ মিলেছে। মূল খাতার অর্ধেকের বেশি খালি থাকা সত্ত্বেও কক্ষ পরিদর্শকের স্বাক্ষর ও তারিখ বিহীন গণিতের সমাধান করা বোর্ডের সরবরাহকৃত অতিরিক্ত খাতা পাওয়া যায়। এমনকি পরীক্ষার্থীর বাবা তদন্ত টিমকে বলেছেন তার সন্তানের অসুস্থতার খবর তার জানা ছিল না।
কক্ষপরিদর্শক দেবাশীষ বলেন, পরীক্ষা চলাকালীন সময় শিক্ষক জহিরুল ইসলাম নয় নম্বর কক্ষে (সিসি ক্যামেরাবিহীন) এমসিকিউ পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সৃজনশীল প্রশ্ন সরবরাহ করেন। কিছুক্ষণ পরেই সহকারী শিক্ষক মেজবা উদ্দিন একই কক্ষে প্রবেশ করে পরীক্ষার্থী হামিম বেপারীর সৃজনশীল প্রশ্নের ছবি তুলে নেন। এক ঘন্টা পরে বোর্ডের সরবরাহকৃত অতিরিক্ত পেপারে প্রশ্নের সমাধান করে হামিমকে সরবরাহ করেন। কক্ষ পরিদর্শক দেবাশীষ শিক্ষক মেজবা উদ্দিনকে বাঁধা দিলে তিনি ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। কেন্দ্র সহকারী জহিরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে থেকে হামিমকে নকলে সহায়তা করেন। এমনকি মেডিকেল সনদ ছাড়া পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সভাপতির অনুমতি ছাড়া সিকবেডে ক্যামেরাবিহীন কক্ষে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে কেন্দ্র সচিবকে অভিযুক্ত শিক্ষক মেজবা উদ্দিন ও জহিরুল ইসলাম চাপ প্রয়োগ করেন।
কেন্দ্র সচিব জানান, তিনি এই প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ নন। মেডিকেল সনদ ব্যতীত বোর্ডের পরামর্শ ছাড়া সিকবেডে (সিসি ক্যামেরাবিহীন কক্ষে) পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ওই দুই শিক্ষক তাকে চাপ প্রয়োগ করেন। বিষয়টি পূর্ব পরিকল্পিত এবং ওই দুই শিক্ষকের এ বিষয়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও তিনি তদন্ত টিমকে জানান।
তদন্ত টিম প্রধান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসীন তাঁর মতামতে উল্লেখ করেন, সহকারী শিক্ষক জহিরুল ইসলাম ও মেজবা উদ্দিন পরীক্ষার্থী হামিম বেপারীকে পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শককে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে সিসি ক্যামেরাবিহীন কক্ষে মেডিকেল প্রত্যয়ন ব্যতীত সিকবেডে গণিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং বোর্ড কর্তৃক প্রদানকৃত অতিরিক্ত উত্তরপত্রে নকল সরবরাহ করায় একই সঙ্গে তারা অসাদাচারণ ও ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত হয়েছেন। ঘটনাটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রবিধানমালা-২০২৪ এর প্রবিধান-৫২ (২)(জ), ৫২ (২) (ঝ) এর দন্ড ও প্রবিধান ৫২ এর অপরাধযোগ্য দন্ড ও দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন এক্ট ১৯৮০ এর ৮ ও ৯ ধারা অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ।
এসএসসি পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কলাপাড়া ইউএনও কাউছার হামিদ বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষকদের পরীক্ষার কার্যক্রম থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব, মহাপরিচালক, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক, উপ-পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদনসহ চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী এ প্রতিবেদক কে বলেন, 'অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি'র ডিজিকে অনুরোধপত্র দেয়া হয়েছে।'
প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম নিয়ম বহির্ভূত ভাবে জাল জালিয়াতি করে বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে করণিক শিপ্রা ভট্টাচার্যের এমপিও ইনডেক্স ব্যবহার করে সহকারী শিক্ষক হিসাবে রহস্যজনক ভাবে বেতন ভাতা উত্তোলন করেন। এনিয়ে পৃথক দু'টি মামলা সহ দুদকে অভিযোগ গেলেও অদৃশ্য শক্তির জোরে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্ত হয়ে বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন তিনি। - গোফরান পলাশ