News update
  • Bangladesh seeks China's involvement, support in Teesta project     |     
  • Rangpur’s Haribhanga mango may fetch Tk 250cr, harvest soon     |     
  • Dhaka becomes world’s most polluted city Thursday morning     |     
  • How Santa Marta Finally Made Fossil Fuel Phase-Out Discussable     |     
  • China's ties with Bangladesh doesn't target any third party: Chinese FM     |     

যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুন: কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর

গ্রীণওয়াচ ডেস্ক প্রবাস 2026-05-07, 7:33am

e92b3253c9afb2e6a4a1fcf0c5a109361fa66496fdc6b2ea-83cd1c152782b621427df414d04a0d221778117611.png




যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পিএইচডি করতে যাওয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন এবং বৃষ্টি; যাদের হাতে ছিল বই, চোখে ছিল আগামীর স্বপ্ন আর হৃদয়ে ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। কিন্তু কে জানত, উচ্চশিক্ষার সেই যাত্রা আর কোনোদিন ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পাবে না!

ঘটনার সূত্রপাত এপ্রিলের মাঝামাঝি। পরিবার ও বন্ধুরা লক্ষ্য করেন ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না তাদের দুজনকে, মেসেজেরও কোনো উত্তর নেই। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও সময়ের সঙ্গে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হলে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এরপরই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক তদন্ত।

কিন্তু কয়েকদিন পর যা সামনে আসে, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়…বরং প্রযুক্তি, পরিকল্পনা আর ঠাণ্ডা মাথার অপরাধের এক ভয়ংকর উদাহরণ। তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, হত্যার আগে অভিযুক্ত ঘাতক অনলাইনে খুঁজেছে— কীভাবে লাশ গুম করা যায়, কীভাবে মৃতদেহ দ্রুত পচানো যায়, এমনকি খুনের প্রমাণ মুছে ফেলার উপায়ও।

আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো— তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, ঘাতক এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এআই টুল বা চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি থেকেও তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

এই ঘটনাকে ঘিরে এখন উঠে আসছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারা ছিলেন এই দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী?

কীভাবে তারা নিখোঁজ হলেন?

কেন তদন্তকারীদের সন্দেহ গিয়ে থামল রুমমেটের দিকে?

“১০ দিনের পরিকল্পনা” বলতে আসলে কী বোঝাচ্ছে পুলিশ?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এআই বা চ্যাটজিপিটির নাম কেন সামনে এলো?

কারা ছিলেন এই দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী?

জামিল আহমেদ লিমন পিএইচডি করছিলেন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে। আর নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক। দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন।

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তার বাবা জহির উদ্দিন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানীর মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পেলে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বৃষ্টি।

অন্যদিকে, জামিল আহমেদ লিমন ছিলেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাথান এলাকার জহুরুল হকের ছেলে। তবে লিমনের বাবা দীর্ঘকাল ধরে চাকরির সূত্রে গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করতেন এবং সেখানেই লিমনের বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা।

কীভাবে তারা নিখোঁজ হলেন?

কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর সংবাদ বহন করে। ঠিক তেমনই এক অস্বস্তিকর নীরবতা থেকেই শুরু হয়েছিল লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার রহস্য। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে হঠাৎ করেই পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমদিকে বিষয়টি খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বাংলাদেশে থাকা লিমনের পরিবারও বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। একের পর এক ফোনকল বা পাঠানো মেসেজেরও কোনো জবাব আসে না। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের কোনো উপস্থিতি দেখা যাচ্ছিল না।

সেই নীরবতা ধীরে ধীরে পরিবারের মনে ভয় আর শঙ্কা তৈরি করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত উদ্বেগ যখন চরমে পৌঁছে যায়, তখন পরিবার ও বন্ধুদের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশের কাছে জানানো হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান। যার শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছিল এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক সত্য।

কেন তদন্তকারীদের সন্দেহ গিয়ে থামল রুমমেটের দিকে?

তদন্তের শুরুতে নিখোঁজের ঘটনাটি সাধারণ ‘মিসিং পারসন’ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, ততই কিছু অসংগত তথ্য সামনে আসতে থাকে। আর সেই সূত্র ধরেই তদন্তকারীদের নজর ঘুরে যায় লিমনের রুমমেট ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হিশাম আবুঘরবেহ’র দিকে।

প্রথম কারণ, নিখোঁজ হওয়ার আগে শেষ যাদের সঙ্গে  লিমন ও বৃষ্টি কে দেখা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে রুমমেট হিশামও ছিলেন। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, লিমনের সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন তিনি এবং ঘটনাটির সময়ও সেই বাসার আশপাশে তার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, তদন্তকারীরা যখন বাসায় তল্লাশি চালান, সেখানে সহিংসতার স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়। বিশেষ করে রক্তের দাগ এবং ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখে ধারণা করা হয়, নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং বড় ধরনের অপরাধ ঘটেছে। তদন্তকারীদের মতে, ঘটনাস্থলের ফরেনসিক আলামতই সন্দেহকে আরও শক্ত করে।

তৃতীয়ত, রুমমেটের বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের মধ্যে মিল ছিল না। নজরদারি ফুটেজ, ফোনের লোকেশন ডাটা এবং চলাফেরার টাইমলাইনে বেশ কিছু গরমিল ধরা পড়ে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল- ঘটনার আগেই তিনি অনলাইনে মরদেহ গোপন করা, ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়! এ ধরনের বিষয় খুঁজেছিলেন। তাছাড়া তার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটি ফার্মেসির রসিদ উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় ঘটনার দিনই তিনি ট্র্যাশ ব্যাগ, জীবাণুনাশক ওয়াইপস এবং গন্ধনাশক স্প্রে কিনেছিলেন।

“১০ দিনের পরিকল্পনা” কী?

তদন্তকারীরা বলছেন, অভিযুক্ত ব্যাক্তি অন্তত ১০ দিন ধরে পরিকল্পনা করছিল। এই সময়ের মধ্যে সে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সার্চ হিস্ট্রি এবং ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে তথ্য খুঁজেছে।

যেমন:

কীভাবে খুনের প্রমাণ মুছে ফেলা যায়

লাশ কোথায় লুকানো সহজ

মৃতদেহ দ্রুত নষ্ট হওয়ার উপায়

পুলিশ তদন্ত এড়ানোর কৌশল

এবং এখানেই সামনে আসে এআইর বিষয়টি

ChatGPT-এর নাম কেন আসছে?

সম্প্রতি বিভিন্ন শিরোনামে বলা হচ্ছে, “ChatGPT খুনের রহস্য ফাঁস করেছে”। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আসলে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে এই হত্যাকাণ্ড উদ্ঘাটন করেনি বা খুনি শনাক্ত করেনি। তদন্তের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্তের ডিজিটাল ডিভাইস ও অনলাইন কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে। সেখানে দেখা যায়, সে বিভিন্ন এআই-ভিত্তিক টুল, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির এর মতো সিস্টেম ব্যবহার করে কিছু তথ্য অনুসন্ধান করেছিল। যেমন- প্রমাণ মুছে ফেলা, লাশ গোপন করার উপায় বা তদন্ত এড়ানোর কৌশল সম্পর্কিত সার্চ ইতিহাস।

অর্থাৎ, এআই এখানে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বা অপরাধ উদঘাটন করেনি। বরং এটি ছিল শুধুমাত্র একটি তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যম, যেমন সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। তদন্তকারীরা এই ডিজিটাল ট্রেইল বিশ্লেষণ করেই বুঝতে পারেন যে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। এই কারণেই সংবাদমাধ্যমে এআই বা চ্যাটজিপিটির নাম উঠে এসেছে। তবে মূল সত্য হলো- তদন্ত করেছে মানুষ, আর এআই শুধু সেই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের অংশ হিসেবে ধরা পড়েছে।

এআই এবং অপরাধ: নতুন উদ্বেগ?

এই ঘটনার পর নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি অপরাধীদের সহায়তা করতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ChatGPT বা অন্যান্য এআই সিস্টেম নিজেরা কোনো অপরাধ করে না বা সিদ্ধান্ত নেয় না। এগুলো মূলত তথ্য বিশ্লেষণ ও সহায়তার জন্য তৈরি প্রযুক্তি। তবে কোনো ব্যক্তি যদি এসব প্রযুক্তি ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তাহলে তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অপরাধ পরিকল্পনার ধারণা খোঁজা, তথ্য গোপন করার উপায় অনুসন্ধান, ভুয়া পরিচয় তৈরির চেষ্টা, কিংবা ডিজিটালভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করা। এসব ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

তবে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দাবি করছে, তাদের এআই সিস্টেমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত থাকে, যাতে সরাসরি বিপজ্জনক বা অপরাধমূলক নির্দেশনা দেওয়া না হয়। এরপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই এর অপব্যবহারের নতুন নতুন দিকও সামনে আসছে।

এই কারণে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো শুধু প্রচলিত প্রমাণ নয়, বরং ডিজিটাল আচরণ, সার্চ হিস্ট্রি এবং এআই ব্যবহারের ধরণকেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এখন কী হবে?

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘটনার মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার অভিযোগ, যা মার্কিন আইনে অত্যন্ত গুরুতর একটি অপরাধ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকি কিছু অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হতে পারে। আইন অনুযায়ী এখন মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে।

তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো ব্যাপকভাবে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালাচ্ছে। সব মিলিয়ে, এটি এখন বিচারিক তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে পরবর্তী ধাপে আসল সত্য এবং দায় নির্ধারিত হবে।