
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। সময় যত গড়াচ্ছিল আর্জেন্টিনার জন্য ভয় ততই বাড়ছিল। সেই ভয়কেই জয় করল লিওনেল স্কালোনির দল। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। লিওনেল মেসির জাদুকরী অ্যাসিস্ট, এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত সমতা ফেরানো গোল এবং লাউতারো মার্টিনেজের যোগ করা সময়ের জয়সূচক গোলে, অবিশ্বাস্য এক কামব্যাকের গল্প লিখেছে আর্জেন্টিনা।
বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ সময় দিনগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি শুধুই একটি ম্যাচ নয়। বরং বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার জন্য দুই ফুটবল পরাশক্তির মর্যাদার লড়াই। প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই প্রতিটি বলের জন্য লড়াই, কঠিন ট্যাকল এবং আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে সেমিফাইনাল।
ম্যাচের ১২তম মিনিটে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে মাঠে। ইংল্যান্ডের অ্যান্ডারসনকে ট্যাকল করেন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ। ফাউলের পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে মর্গান রজার্স ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসও সেই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। সেমিফাইনালের চাপ ও ম্যাচের গুরুত্ব সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০তম মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগ তৈরি করে ইংল্যান্ড। দ্রুত পাসের সমন্বয়ে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে বক্সে নিচু ক্রস পাঠান রিস জেমস। তবে সময়মতো এগিয়ে এসে বলটি নিরাপদে তালুবন্দি করেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
এরপর আর্জেন্টিনাও আক্রমণে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। তবে প্রথমার্ধে দুই দলের রক্ষণভাগই ছিল বেশ সতর্ক।
ম্যাচের ৩৩তম মিনিটে ইংল্যান্ড গোলের প্রথম উল্লেখযোগ্য চেষ্টা করে। ডেকলান রাইসের ফ্রি-কিক থেকে জন স্টোনস হেড করলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্রথমার্ধের শেষদিকে শারীরিক লড়াই আরও বেড়ে যায়। ৩৭তম মিনিটে ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন হলুদ কার্ড দেখেন।
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি বাড়ায় দুই দল। ৪৭তম মিনিটেই গোলের দারুণ সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। ডিজেড স্পেন্সকে পেছনে ফেলে বক্সে ঢুকে জোরালো শট নেন হুলিয়ান আলভারেস, তবে অসাধারণ দক্ষতায় তা ঠেকিয়ে দেন ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। কিছুক্ষণ পর আবারও চেষ্টা করেন আলভারেস, কিন্তু বল চলে যায় গোলবারের পাশ দিয়ে।
ম্যাচের ৫২তম মিনিটে আর্জেন্টিনার রক্ষণে সতর্কতার সংকেত আসে। জুড বেলিংহ্যামকে কঠিন চ্যালেঞ্জ করে হলুদ কার্ড দেখেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। এর ফলে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে আরও সতর্ক হয়ে খেলতে হয়।
৫৫তম মিনিটে ম্যাচের প্রথম গোলটি পায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আক্রমণের ধার বাড়ানো থ্রি লায়ন্সরা অবশেষে সফল হয়। অ্যান্থনি গর্ডন বক্সের কাছাকাছি পাওয়া সুযোগ ঠান্ডা মাথায় কাজে লাগিয়ে বল পাঠান আর্জেন্টিনার জালে। তার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
গোল হজমের পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণে চাপ তৈরি করে তারা। ৬৯তম মিনিটে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ক্রস থেকে গঞ্জালেস হেডে গোলের চেষ্টা করেন, কিন্তু জর্ডান পিকফোর্ডের অসাধারণ সেভে রক্ষা পায় ইংল্যান্ড।
৭৬তম মিনিটে সমতা ফেরানোর বড় সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপর তার আরেকটি হেডও আটকে দেন পিকফোর্ড। মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ড হয়তো জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বদলে যায় পুরো গল্প।
এরপর ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে আর্জেন্টিনার সমতা ফেরানোর নায়ক হয়ে ওঠেন এনজো ফার্নান্দেজ। বক্সের বাইরে থেকে তার দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। ১-১ গোলে সমতায় ফিরে ম্যাচে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা।
সমতা ফেরানোর পর আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। যোগ করা সময়েও তারা আক্রমণের চাপ ধরে রাখে। অবশেষে ৯০+২ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। লিওনেল মেসির দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট থেকে লাওতারো মার্টিনেজ নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল পাঠান ইংল্যান্ডের জালে।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল হয়নি। ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। এক গোল পিছিয়ে থেকেও এমন দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে মেসির দল আবারও প্রমাণ করেছে, বড় মঞ্চে তারা কতটা ভয়ংকর।
এই জয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন পূরণে এখন আর মাত্র একটি ম্যাচ দূরে তারা। মেসির নেতৃত্বে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।