
জমির প্রকৃত দাম নির্ধারণ হলেই কালো টাকা সাদা হওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জমির মৌজা রেটে সত্যিকারের ভ্যালু থেকে কম দেখানো হয়। মৌজা রেট রিভিউ করে রিয়াল ভ্যালুতে নিয়ে আসবো। তাহলে কালো টাকা সাদা হবে না। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশের পরদিন আজ শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিকেলে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
স্থানভেদে জমির প্রকৃত দাম নির্ধারণে কাজ চলছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে বাজেট করতে হয়েছে। তাই অনেক কিছু ইচ্ছা থাকলেও করতে পারিনি। জমির মৌজার রেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, একটি কমিটি হয়েছে। মৌজার রেটগুলো রিভিউ হবে। মৌজার রেটগুলো সত্যিকার ভ্যালুতে আনার চেষ্টা চলছে। যাতে করে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ বন্ধ হয়।
সারাদেশের সার্ভে করতে হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কারণ ধানের জমির এক মূল্য, বাড়ির জমির একটা মূল্য। কিন্তু জমি বেচাকেনার ক্ষেত্রে প্রকৃত দামের থেকে অনেক কম দাম দেখিয়ে নিবন্ধন করা হচ্ছে। তাই সত্যিকার দাম জানতে সার্ভেটা আমরা করতে যাচ্ছি। এটা সম্পূর্ণ হলে মৌজার দাম বাজার দামের সঙ্গে আমরা নিয়ে আসতে পারব, তখন কালো টাকা সাদা করার খুব বেশি সুযোগ থাকবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটের সত্যিকার যে কার্যক্রম, যেটা জনগণের চিন্তার প্রতিফলন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা বিগত দেড় দশক ধরে জনগণ মিস করেছে। বাজেট বলতে মূলত আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলি। আমাদের সংবিধানও সেই কথা বলেছে। তাই জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতিতে দেশ চালাতে হবে। তিনি বলেন, আজকে বহুদিন পর দীর্ঘ সংগ্রাম, দেড় দশকের ওপরে সংগ্রাম, তারপর জুলাই আগস্টের সংগ্রাম, সবার অবদানে অনেকেই জীবন দিয়েছেন, অনেকে পঙ্গু হয়েছেন, অনেকে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরি হারিয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে আজকে দেশের মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশা পূরণে একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছি। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ অধিক আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বি। সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য দুই মাসের মধ্যে আমরা চেষ্টা করেছি একটা সবজনীন বাজেট।
বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে নিয়ে, প্রত্যেকটি নাগরিককে নিয়ে-তাদের জীবনযাত্রার মান ও ভবিয্যৎ সব সময় বাজেটে প্রতিফলিত হয় না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারে বাজেটে চেষ্টা করেছি, প্রতিটি মানুষকে আমাদের বাজেট চিন্তায় নিয়ে আসার জন্য। কোনো শ্রেণিপেশা, ধর্ম, বর্ণ কেউ এই বাজেটের আওয়ার বাইরে নেই বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতিকে আরও গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তি করা ছিল এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে অর্থনীতি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছি আমরা। সীমিত সম্পদের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য বরাদ্দ, কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বাজেট শুধু নীতিমালা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রোডম্যাপ বাজেটে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বেতন বাড়ানো হচ্ছে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারিদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি কমবে। ব্যবসা সহজ করা, বন্দরে দুর্নীতি রোধ ও দীর্ঘমেয়াদি কেনাকাটায় আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অভাব থাকলে দুর্নীতির একটা প্রবণতা থাকে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি হলে দুর্নীতি কমার কথা। গত ১১ বছর ধরে পে-স্কেল হয়নি, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এটা সমন্বয় করা দরকার। বেতন বাড়লে, আয় বাড়বে তখন নিশ্চয় দুর্নীতি কমার কথা।
কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে পরিষ্কারভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগের জন্য জোর দিচ্ছি কর্মসংস্থানের জন্য। স্কিল ডেভলপমেন্টের জন্যও জোর দিচ্ছি। দক্ষ একজন শ্রমিকের চাকরি দেশে-বিদেশে হওয়া সহজ। এ জন্য আমরা স্কিল ডেভলপমেন্ট সংক্রান্ত নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি মৎস্য ও পানি সম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। যা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা যোগারের পরিকল্পনা সরকারের।