
রাজধানীর সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রযুক্তি-নির্ভর নজরদারি জোরদার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের ফলে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন মানার ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মোড় এবং ব্যস্ত সড়কগুলোতে এআই-ভিত্তিক আধুনিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, স্টপ-লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, বেআইনিভাবে লেন পরিবর্তন, জেব্রা ক্রসিং দখল, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠা-নামা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না বাঁধা এবং অননুমোদিত ভিআইপি লাইটের ব্যবহার প্রভৃতি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।
ডিএমপির মুখপাত্র ও উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ১২০টি এআই-চালিত ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বর্তমানে ২০টিরও বেশি ক্যামেরা পুরোপুরি সচল রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার ২০টিরও বেশি প্রধান পয়েন্টে বর্তমানে এআই ক্যামেরা কাজ করছে, যা ট্রাফিক মনিটরিং এবং আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে। পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা শহরকে এআই নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমপির।
মুখপাত্র আরও বলেন, গত সোমবার পর্যন্ত এআই ক্যামেরা সিস্টেমের মাধ্যমে মোট ৫০২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের প্রভাব সম্পর্কে নাসিরুদ্দিন বলেন, এ উদ্যোগে জনগণের সাড়া উৎসাহব্যঞ্জক। এটি জনমনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। অনেক চালক ও যাত্রী এখন স্বপ্রণোদিত হয়ে ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন।
তিনি আরও জানান, প্রযুক্তিনির্ভর এ উদ্যোগ ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শহরের সড়কে যানজট কমাতেও সহায়তা করছে।
তবে ডিএমপির এই কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির টেকসই উন্নতির জন্য আরও ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে: সড়ক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, রাস্তার মাঝখানে বাসযাত্রী ওঠানামা বন্ধ এবং একই রুটে বাস, ট্রাক, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজি বাইকের মতো ভিন্ন গতির যানবাহন একসঙ্গে চলাচল কমানো।
জানা যায়, যেসব মোড়ে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে, সেখানে ট্রাফিক আইন মানার ক্ষেত্রে চালকদের আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
বিজয় সরণি মোড়ে দেখা যায়, সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি স্টপ-লাইনের পেছনে থেমে যাচ্ছে এবং কোনো গাড়ি জেব্রা ক্রসিং দখল করে রাখছে না।
কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও হোটেলের মোড়েও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, চালকরা এখন স্বয়ংক্রিয় মামলার ভয়ে কঠোরভাবে সিগন্যাল মানছেন।
ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ক্যামেরার নজরদারিতে চালকরা আর সিগন্যাল অমান্য করার সাহস পাচ্ছেন না। কেউ লাইন পার হচ্ছে না। বেশিরভাগ চালকই সিগন্যাল মেনে চলছেন। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে আছি এবং লাইটের সংকেত অনুযায়ী গাড়ি থামানো বা ছাড়ার ইশারা দিচ্ছি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এআই-চালিত এই পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ক্যামেরাগুলো ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরতে পারে, দূর থেকে যানবাহনের ওপর জুম করতে পারে এবং স্পষ্টাক্ষরে গাড়ির নম্বর প্লেটও শনাক্ত করতে সক্ষম।
সিস্টেমটি এমন সফটওয়্যারের সঙ্গে সংযুক্ত, যা ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে সক্ষম এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ির মালিক শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) জানিয়েছে, বর্তমানে ক্যামেরাগুলো ৬টি ‘লজিক’ ব্যবহার করে বিভিন্ন ট্রাফিক অপরাধ শনাক্ত করছে এবং সংশ্লিষ্ট ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ডিএমপি সার্ভারে সংরক্ষণ হচ্ছে। পরবর্তীতে টিটিইউ কর্মকর্তারা সেই ফুটেজগুলো পর্যালোচনা করেন এবং ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যার’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল মামলা দায়ের করেন।
কর্মকর্তারা জানান, এ ব্যবস্থা এখনও নতুন হওয়ায় ট্রাফিক পুলিশ বর্তমানে ছোটখাটো আইন লঙ্ঘনকে কিছুটা শিথিল দৃষ্টিতে দেখছে।
ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আইন লঙ্ঘনের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে কি না কিংবা স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে কি না— মামলা করার ক্ষেত্রে আমরা বর্তমানে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছি।
বর্তমানে পুলিশ ডাকযোগে মামলা নোটিশ পাঠাচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসএমএস ও অ্যাপভিত্তিক নোটিফিকেশন চালু করার পরিকল্পনা করছে। চালকরা তাদের আইন লঙ্ঘনের ভিডিও ফুটেজ সরাসরি দেখার জন্য লিঙ্কও পাবেন। পুলিশ বলছে, এ পদক্ষেপ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে।
গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এআই-ভিত্তিক আইন প্রয়োগের উদ্যোগটি শুরু হয়। এর আগে ২৯ এপ্রিল পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির ডিএমপি সদর দপ্তরে সফটওয়্যারটির উদ্বোধন করেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এআই নজরদারির এই সম্প্রসারণ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশিং ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার দেশব্যাপী বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। এর লক্ষ্য হলো নগর নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিক সেবা প্রদান ব্যবস্থা উন্নত করা।
কর্তৃপক্ষ জানায়, এআই প্রযুক্তি এখন স্মার্ট সিসিটিভি সিস্টেমেও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি, পরিত্যক্ত বস্তু, অস্ত্র, সহিংস আচরণ এবং সম্ভাব্য হুমকি তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।
কর্মকর্তারা আরও জানান, সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি, ডিপফেক-সংক্রান্ত অপরাধ এবং অপপ্রচার মোকাবিলায় বাংলাদেশ ক্রমশ এআই টুলস-এর ব্যবহার বৃদ্ধি করছে।
সূত্র: বাসস