
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যেন ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনার শেষ নেই। একের পর এক শোডাউন আর বর্ণিল আয়োজনে মুখর হয়ে উঠছে শহর। এবার সেই উন্মাদনায় মেতে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। আকাশী-সাদা রঙে ছেয়ে যায় পুরো শহর।
সোমবার (১৫ জুন) বিকেল গড়াতেই শহরের মুক্তিযোদ্ধা মাঠে জড়ো হতে থাকেন কয়েক হাজার সমর্থক। কারও গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, কারও মুখে আঁকা পতাকার রঙ। হাতে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি প্রিয় দলের পতাকা নিয়ে উপস্থিত হন অনেকে। কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউবা মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে অংশ নেন এ আয়োজনে। ভুভুজেলার শব্দ, ডিজের তালে তালে উচ্ছ্বাস আর বিশাল আর্জেন্টিনার পতাকা-সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।
শুধু তরুণরাই নন, পরিবার-পরিজন আর শিশু সন্তানদের নিয়েও অংশ নেন সমর্থকেরা। ছোটদের গায়েও ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি, চোখেমুখে ছিল আনন্দের ছাপ.
শহরের টেকপাড়া থেকে আসা আরিফ বলেন, ২০০৫ সালে আমরা যে বিশ্বকাপের আনন্দ পেয়েছিলাম, ২০২৬ সালেও আমরা সেটাকেই মনে করি। এখনও মনে হয় যেন সেই অনুভূতিটাই আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। আমাদের এখানে ত্রিস্তরীয় তারকা দেখে আমরা গর্ব অনুভব করি। আমরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মেসির ভক্ত, মেসির অনুরাগী।
মোহাজেরপাড়া থেকে আসা মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ২০২২ বিশ্বকাপে মেসির অসাধারণ নৈপুণ্যে আমরা আর্জেন্টিনার যে ট্রফি জয়ের আনন্দ পেয়েছিলাম, তা ছিল অবিস্মরণীয়। এবারও আমাদের আশা, আর্জেন্টিনা ভালো খেলবে এবং শিরোপা জয়ের পথে এগিয়ে যাবে। মেসির জাদুকরি নৈপুণ্যে এবারও আমরা দারুণ খেলা উপভোগ করব।
রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আমার ভাইয়েরা কাতার থেকে এই পুরো সেটআপ পাঠিয়েছে, কারণ আমি আর্জেন্টিনার একজন বড় ভক্ত। আমি আর্জেন্টিনাকে খুব ভালোবাসি।
তিনি আরও বলেন, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই, অনেক টানটান উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইও হবে। তবে শেষ পর্যন্ত আমি মনে করি, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা—দুই দলই ফুটবলের দুই শক্তি, তারা একে অপরের ভাইয়ের মতোই। এবারের বিশ্বকাপে আমরা আর্জেন্টিনার সাফল্য কামনা করি, বিশেষ করে মেসির জন্য। আমরা চাই আর্জেন্টিনা ভালো খেলুক এবং শিরোপার পথে এগিয়ে যাক।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, খেলা যারা উপভোগ করে, যারা খেলার শৈল্পিকতা ছড়িয়ে দেয়, আমরা সবসময় তাদেরই সমর্থন করি। এখানে এত বিপুল সংখ্যক দর্শক, সমর্থক এবং আর্জেন্টিনাপ্রেমী মানুষের উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায় আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা কতটা ব্যাপক।
একপর্যায়ে শুরু হয় বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। সামনে ঘোড়া আর বিশাল আর্জেন্টিনার পতাকা, তার পেছনে মোটরসাইকেলের বহর। এরপর হাজারো সমর্থকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়ক। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শোভাযাত্রাটি পৌঁছে যায় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। সমর্থকদের স্লোগান, গান আর উচ্ছ্বাসে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর।
বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা
সমুদ্রসৈকতেও থামেনি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাস। সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার পর তারা জড়ো হন সি-গাল পয়েন্টে। সেখানে উড়ানো হয় আকাশী-সাদা রঙের ধোঁয়া। বালুচরে স্থাপন করা হয় ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের বড় ফটোকার্ড। পর্যটক ও সমর্থকেরা সেসবের সামনে ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখেন মুহূর্তগুলো।
দিনের আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল সৈকতের বালুচরে মানবপ্রাচীর গড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরি। শত শত সমর্থকের অংশগ্রহণে তৈরি সেই দৃশ্য মুগ্ধ করে উপস্থিত সবাইকে।
সমর্থকদের ভাষ্য, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি ভালোবাসা ও আবেগের নাম। প্রিয় দল এবং প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়াতেই তাদের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
আয়োজক ফারুক আজম বলেন, বাংলাদেশে, বিশেষ করে কক্সবাজারে, যে বিপুলসংখ্যক আর্জেন্টিনা সমর্থক রয়েছেন, তা বিশ্বকে জানান দিতেই সমুদ্র সৈকতে এই র্যালির আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজক দেবু বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই সুশৃঙ্খল আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ কতটা আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ ও কক্সবাজারের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি এবং শৃঙ্খলাবোধকেও বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে চেয়েছি।
আর্জেন্টিনার সমর্থকগোষ্ঠীর সমন্বয়ক মো. মোরশেদ বলেন, আমরা বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই যে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা শুধু প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসাই প্রকাশ করছেন না, বরং বাংলাদেশ ও বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আকাশী-সাদার রঙে রাঙানো এই আয়োজন যেন আরেকবার প্রমাণ করল বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশ্বকাপের আবেগ শেষ হয় না কখনোই। আর সেই আবেগকে ঘিরেই উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল কক্সবাজার।