
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) অভিযোগ করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এর মধ্যেই টানা তৃতীয় দিনের মতো ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে এক বিবৃতিতে ইউএইর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের সময় দুটি আমিরাতি ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে ইরান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন এবং আটজন আহত হন। আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় ও দুজন ইউক্রেনের নাগরিক। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর। খবর বিবিসির।
আমিরাত এই হামলাকে ‘বেপরোয়া ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ নিরাপত্তা চার্জ আরোপ করবে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রই হবে হরমুজ প্রণালির রক্ষক। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ হিসেবে এই পথে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ চার্জ নেওয়া হবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের জাহাজ বা তাদের গ্রাহকরা এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। তবে অন্য সব দেশের জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকবে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেল ৪টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর হবে বলে তিনি জানান।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমরা ইরানকে খুব কঠোরভাবে আঘাত করছি। তাদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা এখনও রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সোমবার সন্ধ্যায় ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে।
এর জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সম্ভবত আমরা হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করব। ইরান চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই আমরা এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যে পক্ষ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করবে, সে পারিশ্রমিক পেতে পারে। তবে ইরান সবসময়ই এই প্রণালির রক্ষক ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে একতরফাভাবে টোল বা ফি আদায়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডও সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। তারা দাবি করেছে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।