
জর্ডানের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় ২ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া একজন মার্কিন সেনা নিখোঁজ রয়েছেন। এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যে টানা অষ্টম দিনের মতো প্রাণঘাতী পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এই সংঘাতের কারণে বর্তমানে পুরো অঞ্চল চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। খবর বিবিসির।
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দারখোভিনে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত রাতে মার্কিন বাহিনী আঘাত হেনেছে। একই রাতে ইরানের কেশম দ্বীপেও মার্কিন হামলা চালানো হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালিয়েছে ইরান। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, এই হামলার ফলে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবারেও কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি বিমান ঘাঁটি ও ডিপো লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছিল।
স্থানীয় সময় রোববার (১৯ জুলাই) সময়ে জর্ডানের সামরিক বাহিনী তাদের আকাশসীমায় তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। চতুর্থ আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পতিত হয়েছে। এর আগে জর্ডানের আকাবা বন্দর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে মার্কিন প্রশাসন সতর্কবার্তা দিয়েছিল। জর্ডানের দিকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ যেন নিজেদের ভূখণ্ডে না পড়ে, সেজন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বেশ কিছু ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। ইসরায়েল ও জর্ডানের যৌথ সীমান্তের কাছে অবস্থিত ইলাত শহরের নিকটে ইন্টারসেপ্টরের কিছু খণ্ডাংশ পাওয়া গেছে। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি উভয় পক্ষই পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানছে। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। জবাবে তেহরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের সতর্কতা অমান্য করায় হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যেসব জাহাজ অনিরাপদ রুট ব্যবহার করবে, তারা নিশ্চিতভাবেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিটি চুক্তি স্বাক্ষরের এক মাসের মাথায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করেন। মার্কিন সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টানা অষ্টম রাতের এই হামলা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হুমকি সৃষ্টির সক্ষমতাকে দুর্বল করার জন্য চালানো হয়েছে। পাশাপাশি জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালানো আইআরজিসি বাহিনীকে দ্রুত শাস্তি দেওয়াও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। জর্ডানের ঘাঁটির ভেরিফাইড ফুটেজে অন্তত দুটি আঘাত ও একটি বিস্ফোরণের চিত্র দেখা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ নিহত সেনাদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, বীরদের এই আত্মত্যাগ মার্কিন সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে। চলতি মাসের শুরুতে নিখোঁজ হওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর একজন পাইলটকে মৃত ঘোষণার পর এই সংঘাতের জেরে মোট মার্কিন সেনার নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।
অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে মার্কিন হামলায় দেশটিতে অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
কুয়েতের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার পর বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) তেহরানের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনেছে।
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও রসদ অবকাঠামোতেই আঘাত হানছে। যদিও ইরান দাবি করেছে যে মার্কিন হামলায় তাদের সেতু ও স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক এলাকায় হামলা অবৈধ হলেও কোনো বেসামরিক স্থাপনা যদি শত্রুর যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তায় ব্যবহৃত হয়, তবে তা সুরক্ষার অধিকার হারায়।
এই চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়ে শনিবার (১৮ জুলাই) রাতে এক লিখিত বিবৃতিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, আমেরিকার বারবার চুক্তি লঙ্ঘন একটি মৌলিক সত্যকে উন্মোচিত করেছে। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য বা গ্রহণযোগ্যতা নেই।