
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা।
স্থানীয় সময় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অন্য কোনো হামলা বা হতাহতের ঘটনা নিশ্চিত করেনি তারা। খবর বিবিসির।
এর আগে শনিবার সৌদি রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে জ্বালানি ট্যাংক থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এ ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়।
রিয়াদে প্রথমবারের মতো বিমান হামলার সতর্কসংকেতও বেজে ওঠে। গত জুলাইয়ে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবে হামলা বাড়ানোর পর এটিই ছিল রাজধানীতে এমন সতর্কতা জারির প্রথম ঘটনা।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল ও অন্যান্য ভ্রমণ বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দরও রয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিশ, তায়েফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো ‘শত্রুতামূলক প্রচেষ্টা’ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছে।
হুথি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহইয়া আল-সারিয়া অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, রিয়াদের ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ এবং লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি হামলার জবাব হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। সানা বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এর আগে আল-সারিয়া অভিযোগ করেছিলেন, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনে প্রায় ৩০০টি হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুথিদের দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। সৌদি আরব ওই সরকারকে সমর্থন করে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের আকাশে একটি সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা।
এএফপির এক প্রতিবেদনে দুই পক্ষের সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, শনিবার হুথি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন। হুথিরা তাদের ৩১ যোদ্ধা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বাহিনী ১৭ সেনা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ ছাড়িয়েছে বলে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
শনিবার রিয়াদে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ব্যাপক বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বেশ কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল হয়েছে।
এএফপির এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, আরামকোর একটি পুড়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাংকের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দমকলকর্মীদের দেখা গেছে।
রিয়াদসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য বিপদের সতর্কতা জানিয়ে আগেই মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়েছিল সৌদি সিভিল ডিফেন্স। শনিবার সকালে পরে নিরাপদ পরিস্থিতির ঘোষণা দেওয়া হয়।
রিয়াদের এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, সতর্কসংকেত শোনার পর তিনি একের পর এক বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছেন। তার ভাষায়, ‘আমি সতর্কসংকেত শুনলাম, এরপর আমার জানালা কেঁপে উঠল। বিষয়টি সত্যিই ভয়ংকর ছিল।’
এদিকে, সম্প্রতি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোকা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে হুথিরা। এসব এলাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর এশিয়া ও ইউরোপে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে অবস্থিত।
হুথিরা জানিয়েছে, তাদের নৌ অবরোধ সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনে হুথি নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরে অবরোধের পাল্টা পদক্ষেপ।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি জাহাজগুলো তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওই নৌপথের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, শুক্রবার বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের দামের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীদের এক বিরল নোটে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, তা মডেল করা তাদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না।