জ্বালানি দক্ষ ভবনের জন্য পাইলটিং করতে প্রকল্প নিন - জ্বালানি উপদেষ্টা

2021-09-27, 2:12pm খবর

screenshot-685-196c7b0a09180fd034bdf4007992d8041632730339.png

Screenshot. Energy and power

ভবনে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পাইলটিং করার বিষয়টি খুব জরুরি। পাবলিক ভবনে এটা কিভাবে সাফল্য আনতে পারে তা যাচাই করার জন্য স্রেডাকে একটি প্রকল্প গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ড.  তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম। এনার্জি এন্ড পাওয়ার আয়োজিত “এনার্জি এফিসিয়েন্সি ইন পাবলিক বিল্ডিংস” শীর্ষক টকসে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপরের কথাগুলো বলেছেন।

স্রেডা ও জিআইজেড এর সহায়তায় ইপি টকসে মোল্লাহ আমজাদ হোসেন সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসাবে ছিলেন অতিরিক্ত সচিব এবং সাসটেনেবল এন্ড রিনিয়েবল এনার্জি ডেভলপমেন্ট অথরিটির (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব মো. সাইফুল্লাহিল আজম। আলোচ্য বিষয়ের উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেড্রার সদস্য (এনার্জি এফিসিয়েন্সি এন্ড কনজারভেশন) ফারজানা মমতাজ।

প্যানেলিস্ট হিসাবে কথা বলেছেন, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. জহরুল হক এবং গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল হক।

ড. তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী আরও বলেন, এনার্জি এফিশিয়েন্সি নিয়ে কারিগরি বিষয়ে সমাধান ধাপে ধাপে করতে হবে। যেমন ২০১০ সালে আমাদের উদ্যোগে সারাদেশে প্রায় দেড় কোটি সিএফএল বাল্ব বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছিল। আসলে সচেতনতা তৈরি করতেই এমন উদ্যোগ। যদিও বাল্বের মান নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর উদাহরণ অনুসরণ করে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিজ হাতে এসি লাইটের সুইচ বন্ধ করতে হবে।

সরকারের সিদ্ধান্ত আছে এসির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি রাখার। এক্ষেত্রে আমরা মোটেই সচেতন না। অনেক সময় আমরা ঘরে কেউ না থাকলেও এসি, লাইট জ্বালিয়ে রাখি। 

সরকারি ভবনেই এমনটা বেশি দেখা যায়। আমাদের মিতব্যয়ি হতে হবে। এসির ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত মানলে আর বের হওয়ার সময় সুইচ বন্ধ করলে এমনিতেই বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে। ব্যক্তিগত অভ্যাস দিয়ে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব।

ভবনকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী করতে হয়তো ২০-২৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে এটা ১০০ বা ২০০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে এ পরিমাণ টাকা আসলে কিছু না। সরকার এক্ষেত্রে পুরো দায়িত্ব নেবে। গণপূর্তকে এর দায়িত্ব নিতে হবে না। অন্য কোনো খাত থেকে এ ব্যয় নির্বাহ করা হবে। একটা পাইলট প্রজেক্ট করা যেতে পারে। সরকার এর ব্যয় পুরোটা বহন করবে।

এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সুইচ বন্ধ হয়ে যায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। এসির তাপমাত্রা যেন ২৮ ডিগ্রির কম না করা যায় এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন তৈরিতে পূর্ণ সহায়তা করবে। টাকা তেমন কোনো সমস্যা হবে না। সেইসঙ্গে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। তারাও যেন এমন ভবন তৈরিতে এগিয়ে আসে। সেখানেও সরকারি সবরকমের সহযোগিতা থাকবে।

মূল প্রবন্ধে ফারজানা মমতাজ বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন নিয়ে স্রেডা একটা নিরীক্ষা কার্যক্রম শেষ করেছে। সরকার ২০২১ সালে ১৫% আর ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে। শুধুমাত্র আবাসিক খাত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী করা গেলে প্রায় ২৯% জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।

আমরা যদি সিএফএল বাল্ব বদলে এলইডি ব্যবহার করি, সনাতন পদ্ধতির এসির বদলে ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি ব্যবহার করি আর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহার করতে পারি তাহলে ৫০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব।

প্রবন্ধে বলা হয়, গণপূর্ত, শিক্ষা বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগ মিলিয়ে দেশে প্রায় ৮৫ হাজার সরকারি ভবন আছে। এরমধ্যে গণপূর্তের ১৪ হাজার, যার ২৭৩টি টাকায়। ৮০ কোটি থেকে ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই ভবনগুলো থেকে বছরে ১১ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘণ্টা বিদ্যুৎ/বার্ষিক সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে বছরে ১১ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কার্বন দূষণ।

নিরীক্ষার সুপারিশগুলো হলো: ১. কম্পিউটার ব্যবহারে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মোড ব্যবহার করতে হবে। ২. ফ্লুরোসেন্ট টিউব লাইটের বদলে এলইডি বাল্ব ব্যবহার করতে হবে। ৩. সনাতন পদ্ধতির সিলিং ফ্যান ব্যবহার না করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহার করতে হবে। ৪. পুরোনো এসির বদলে ইনভার্টার প্রযুক্তি সহ এসি ব্যবহার করতে হবে। ৫. ভবনগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কাচ ব্যবহার করতে হবে। ৬. বিদ্যুৎ ব্যবহারে গতানুগতিক অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া একটা সমন্বিত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী গাইড লাইন তৈরি করতে হবে।

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ভবনগুলোকে জ্বালানি দক্ষ করা একটি বড় কাজ। প্রাথমিক পর্যায়ে পাবলিক বিল্ডিংকে জ্বালানি দক্ষ করার উদ্যোগ হিসাবে ১২টি ভবনে সমীক্ষা করা হয়েছে। এর আলোকে কাজ চলছে, প্রয়োজনে সমীক্ষা আরো করা হবে। এটার জন্য সরকারি জনবল উন্নয়নে স্রেডা সহসাই প্রশিক্ষণ শুরু করবে। ২০২০ সালে গৃহীত বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে ভবনে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে করণীয় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্রেডা অডিটর তৈরির কাজ করছে। অন্যদিকে ইকুপমেন্টের যে ঘাটতি আছে তা পূরণে স্রেডার পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, আলোচ্য বিষয় আমার জন্য নতুন হলেও দেশের হাসপাতালগুলোকে জ্বালানি দক্ষ করার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবো। এটার প্রথম উদ্যোগ হিসাবে সচিবের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ঢাকায় একটি পাবলিক হাসপাতালকে পাইলট হিসাবে জ্বালানি দক্ষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রফেসর ড. জহুরুল হক বলেন, কনভেনশনাল ফ্যানের পরিবর্তে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের সুপারিশ করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান বিদ্যুৎ কম খরচ করছে ঠিকই কিন্তু বাতাস ঠিকমতো দিচ্ছে না। যদিও ফ্যান আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটা বড় অংশ নিয়ে আছে। এছাড়া ইনভার্টারসহ এসির দাম বর্তমান প্রযুক্তির এসির চাইতে অন্তত ২০ হাজার টাকা বেশি।

এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। এছাড়া আমরা রুমে রুমে এসি ব্যবহার করব নাকি সেন্ট্রাল এসির দিকে যাব সেটাও ভাবতে হবে। সেন্ট্রাল এসি করলে বিদ্যুৎ ব্যবহার অনেক কমে যাবে।

ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল হক বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর গ্রিন এনার্জি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। বর্তমানে সেকথা মাথায় রেখেই ভবন তৈরি করা হচ্ছে। এনার্জি ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ যাতে কম হয় সে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ করা প্রয়োজন। আমরা জানি ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ তৈরির চেয়ে ১ কিলোওয়াট সাশ্রয় করা অনেক লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব। তিনি মনে করেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৬ তলার বেশি উচু ভবনগুলোকে জ্বালানি দক্ষ করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। - এনার্জি এন্ড পাওয়ার