প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

2021-10-04, 1:21pm খবর

screenshot-698-d012078d58c6567ca855ebdf6c180ab41633332064.png

Screenshot (698)

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম ওঠানামার এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়। তা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে। পোস্ট কোভিড অথনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে এবং বিশ্বের অনেক দেশ কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে শুরু করায় জ্বালানি মূল্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে এলএনজির দামে বাড়তি চাপ পড়েছে। তারা বলেন, নিজস্ব জ্বালানিসম্পদ আহরণে পিছিয়ে থাকা, অনেক আগেই আমদানি নির্ভর হয়ে পড়া বাংলাদেশকে সাবধানে জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে এলএনজি কেনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। স্পট বাজারে বেশি নির্ভরতা এবারের মতো সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কেননা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি কার্গো এলএনজি প্রতি মএমবিটিউ ২৯ ডলারের বেশি দামে কিনেছে। অক্টোবর মাসের জন্য দুটি কার্গো ৩৬ ডলার দামে কিনতে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সহনীয় দামে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।

“গ্যাস সর্টেজ, এলএনজি প্রাইস ভোলাটিলিটি: বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল পার্সপেক্টিভ”শিরোনামে ইপি টকস-এ প্রধান অতিথি হিসাবে যুক্ত হন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম প্রেসিডেন্সির স্পেশাল এনভয় জনাব আবুল কালাম আজাদ। গেস্ট অব অনার হিসাবে ছিলেন বুয়েটের সাবেক প্রফেসর ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও এনার্জি এন্ড পাওয়ারের কন্টিবিউটিং এডিটর ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আবদুস সালেক। প্যানেলিস্ট হিসাবে অংশ নেন সামিট গ্রুপের উপদেষ্টা ও পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এমডি কামরুজ্জামান এবং তরুণ উদ্যোক্তা বিজিএমই’র পরিচালক ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাভিদুল হক। এনার্জি এন্ড পাওয়ার আয়োজিত এই টকস সঞ্চালনা করেন ইপি এডিটর মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, এক সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৯০ ভাগ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণ মোটামুটি যথাযথ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এনার্জি এফিশিয়েন্সি নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে এখনও কিছুই করা যায়নি। যদিও সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় আমরা বিপুল অঞ্চলের অধিকার পেয়েছি।

আমাদের বাতাসের যে গতি আছে তাতে উপকূলে ৩০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সাগরের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোথাও কোথাও হচ্ছে। বিষয়টি দেখা যেতে পারে।

তবে বিদ্যুৎ আমদানি নিয়ে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। ভারত নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি আরো অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কেননা ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে জল এবং সোলার বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারলে তা আমাদের কার্বনমুক্ত বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন বলেন, আসলে আমরা স্পট মার্কেট বুঝি কি না তা ভেবে দেখতে হবে। তেল আর গ্যাস বাজার এক নয়। ওপেক তেল মার্কেটের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। কিন্তু এলএনজির ক্ষেত্রে তেমন কিছু নেই। গ্যাসের স্পট মার্কেট নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তিও আছে।

বর্তমানে ইউরোপে ব্যাপক শীত পড়েছে। কোভিডের পরে হঠাৎ করে শিল্পখাতে ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। এমন সময়ে আমাদের স্পট মার্কেটই ভরসা। তবে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি না করে স্পট মার্কেটে জ্বালানি কেনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া জ্বালানির মূল্য গড় হিসাবে চিন্তা করতে হবে। এখন দাম বেশি কিন্তু এক সময় অনেক কম ছিল। তাই গড় হিসাবে ধরলে এলএনজি বা জ্বালানির মূল্য আসলে একই থাকবে।

হুটহাট করে পরিকল্পনা বদল করা সঠিক নয়। আমরা হঠাৎ করেই ১০টি কয়লা প্রকল্প বন্ধ করে এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলাম। নিজস্ব কয়লা তোলা বন্ধ রাখলাম পরিবেশের কথা বলে, যদি আমাদের তা করার কোনো দায় নেই। কয়লা ও পরামাণু দিয়ে বেইজ লোড বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে, এলএনজি নয়। এটা হতে পারে পিকিং পাওয়ার জ্বালানি।

ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আবদুস সালেক সুফী তার উপস্থাপনায় বলেন, জ্বালানির বাজারে আগুন লেগেছে। এদিকে শীতও চলে এসেছে। ওয়েস্টার্ন ইউরোপে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এশিয়াতেও গ্যাস সমস্যা গুরুতর। চীনে কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে লোডশেডিং হচ্ছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিউ ৩৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।

বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। যাতে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ সেখান থেকে পাওয়া যায়। আর ২০ শতাংশের জন্য স্পট বাজারের উপর নির্ভর করা যেতে পারে। 

সঠিক দামে এলএনজি কেনার জন্য প্রাইস গেজিং অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া চীন, জাপান, কোরিয়া যারা বড় জ্বালানি আমদানিকারক তাদের সঙ্গে কোয়ালিশন করে আমদানি করা যেতে পারে।

বিশ্ব বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮০ ডলার চলছে। তা ১০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় এলএনজি উৎপাদন দুর্ঘটনার কারণে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এলএনজি উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া তাদের রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সমস্যা হলো গ্যাস থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। এর পরিমাণ প্রায় ৫১ ভাগ। ফার্নেস অয়েল, ডিজেলও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। এমনিতেই আমাদের গ্যাস উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সামনের দুই বছরে আরও কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাতারবাড়ি এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে কাজ হচ্ছে। এছাড়া পায়রা গভীর সাগরে এফএসআরইউ করার জন্য দুটি প্রস্তাব সরকারের বিবেচনায় আছে। আমার মনে হয় তা হবে খুব ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ভারত থেকে এলএনজি পাইপ লাইনে আমদানি নিয়ে দুটি এমওইউ হয়েছে। তবে এর সম্ভাবনা খুব কম।

নিজস্ব গ্যাসফিল্ড থেকে ১ বা দেড় বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ঘণফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। গ্যাস সংকট ও দামের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে লিকুইড ফুয়েল পাওয়ার প্ল্যান্ট যেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা হয়েছে সেগুলো আরো ৩-৪ বছর চালু রাখার বিষয় ভাবা যেতে পারে। বর্তমানে টেক্সটাইল বা গার্মেন্ট সেক্টরে অনেক অর্ডার আসছে, আরও আসবে। এগুলো মিট করতে হলে প্ল্যান্টগুলো চালু রাখা দরকার। তবে ফুয়েল সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব তাদের উপরে ছেড়ে দিতে হবে।

ইঞ্জিনিয়ার এমডি কামরুজ্জামান বলেন, এলএনজির দাম ওঠানামা অস্বাভাবিক কিছু না। কিভাবে এ দর উঠানামা মোকাবেলা করব সেটাই বিবেচ্য। ফুয়েল মিক্স নিয়ে কথা বলি কিন্তু এখানে কাজ হয়েছে খুব কম। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কেনা চুক্তির ব্যবস্থা রাখতেই হবে। এখনি মধ্য বা দীর্ঘ মেয়াদি জ্বালানি ক্রয় চুক্তির দিকে যাওয়া দরকার। স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনা কখনই লাভজনক হবে না। দীর্ঘ মেয়াদি জ্বালানি চুক্তি না থাকায় এরই মধ্যে আমাদের স্পট থেকে ৩টি কার্গো কিনতে বর্তমানের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।

বর্তমান সংকট কাটাতে ৩-৪ বছর লাগবে। সাময়িক সমাধান হিসেবে গ্যাসফিল্ডগুলোর উৎপাদন বাড়াতে হবে। কারণ শিল্প অবশ্যই চালু রাখতে হবে। এলএনজির দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এটা ধরে নিয়েই পুরো ম্যানেজমেন্ট করা দরকার। জাপান, কোরিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ক্রয় নিয়ে কোয়ালিশন সময় সাপেক্ষ বিষয়।

নাভিদুল হক বলেন, এলএনজি আমদানির পর দেশে গ্যাসের যে গড় দাম হবে তার পুরোটাই পরিশোধ করতে হলে বস্ত্রখাত কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষম থাকবে না। তাই এই খাতের স্বার্থে সাবসিডি দেওয়া আরো কিছু সময় পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে।

জনাব হক বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আমাদের অনেক বড় ক্রেতা যারা দেশের প্রায় ১০০ কারখানার সাথে কাজ করে তারা বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল মনিটর করে কস্ট নির্ধারণ করছে। এখন বেশি অর্ডার আসছে বলে কোনো কোনো ফ্যাক্টরি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো এফিশিয়েন্ট এনার্জি ব্যবহার নিজেদের স্বার্থেই করছে। কিন্তু অনেকেই এফিশিয়েন্ট এনার্জি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে। বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে স্মার্ট মিটার বসান জরুরি। ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রেও এনার্জি এফিশিয়েন্ট হতে হবে। আরও ৩-৪ বছর আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে শিল্প চালাতে হলে ব্যাপক চাপে পড়বে। তাছাড়া ব্যাপক কম্পিটিশনের কারণে যেকোনো ধরনের সরবরাহ সংকট শিল্পে ব্যাপক সমস্যা তৈরি করবে। আইপিপিগুলো ভালো কাজ করছে।

মুর্তজা আহমেদ ফারুক মনে করেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্স’র সাথে জয়েন ভেঞ্চার করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দুটি ব্লকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জেভি করা হলে অনুসন্ধান কাজে গতি আসবে। তবে তিনিও একক নীতি থেকে সরে এসে স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে আইওসিদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। - ইপি টকস