
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংস্কারের বিষয়ে রায় দেবে দেশের জনগণ। তবে সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের এক বক্তব্যের সূত্র ধরে অনলাইন এবং অফলাইনে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং অন্তর্বর্তী সরকার আরও ১৮০ দিন ক্ষমতায় থাকবে কি না তা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। এটি ১৭ কিংবা ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে না বলেও মনে করেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত সময়ে (ক্ষমতা) হস্তান্তর হবে। যদি দেখা যায় তিন দিনের মধ্যে এমন হয় যে, সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের লিডারকে (নেতা) ডাকা হচ্ছে, যে আপনি আসেন শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তিন দিনের মধ্যে এটা হয়ে যেতে পারে। ১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারিতেও হতে পারে। আমার মনে হয় না এটি ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে।’
এছাড়া আজ আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াতে পারেন সে বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এখন আপনাদের চূড়ান্ত কিছু বলতে পারব না। তবে আমাদের সামনে দুটি অপশন (বিকল্প) আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্টস পেজে যে ব্যাখ্যা দেয়া হলো
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্টস পেজ থেকেও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ওই ব্যাখ্যায় দাবি করা হয়েছে আলী রীয়াজের কমেন্ট বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যে কারণে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। এতে আরও দাবি করা হয়, কোনোভাবেই অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন আরও ক্ষমতা ধরে রাখবে না। বরং নির্বাচিত এমপিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। আর তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করবেন।
ব্যাখ্যায় বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট নিয়ে নানা অপপ্রচার চলছে। একাধিক ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে ৬ মাস পরে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ইউনূস সরকার।
এ সম্পর্কিত কী-ওয়ার্ড সার্চ করে দেখা যায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংসদ সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বাধা তৈরি হবে—এমন ধারণা মোটেই সঠিক নয়। সংসদ প্রথম দিন থেকেই নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক কার্যাবলি যেমন: সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট তৈরির কাজ করবে। তবে বিদ্যমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরিয়ে আনতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। এ জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবেন।’
অর্থাৎ আলী রীয়াজ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে—এমন কথা বলেননি; বরং নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই এই দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।
এছাড়াও জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদের দ্বৈত ভূমিকা থাকবে—যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। অর্থাৎ সরকার হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই কাজ করবেন, অন্তর্বর্তী সরকার নয়।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী—
৭। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, উহার কার্যাবলি ও বিলুপ্তি।
(১) গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (হ্যাঁ) সূচক হইলে—
(ক) এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হইবে, যাহা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবে;
(খ) উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করিবেন;
(গ) পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হইতে ১৮০ (একশত আশি) কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করিবে এবং তাহা সম্পন্ন করিবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হইবে।
অর্থাৎ ৭ অনুচ্ছেদের (খ) অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদের দ্বৈত ভূমিকা থাকবে। জনপ্রতিনিধিগণ একদিকে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন, অন্যদিকে একইসঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কারের গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। আদেশ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিলুপ্ত হবে। তখন থেকে সংসদের আর দ্বৈত ভূমিকা থাকবে না; জনপ্রতিনিধিগণ কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করবেন।
এই আদেশে ১৮০ দিন অন্তর্বর্তী সরকার বহাল থাকবে—এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং স্পষ্টভাবে সংসদের দ্বৈত ভূমিকাই উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোট গণনা ও সরকার গঠনে এবার কত সময় লাগবে (বিশেষজ্ঞ মত)
ভোট গণনা, গণভোটের কোনো প্রভাব সরকার গঠনে থাকবে কি না এবং নতুন সরকার নিয়ে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীনের।
তার মতে, নির্বাচন কমিশনের দেয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা নতুন সরকার দেখতে পারব। সেক্ষেত্রে গণভোট এবং পোস্টাল ব্যালটসহ স্বাভাবিক ভোট গণনায় এবার একটু বেশি সময় লাগতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হলে সর্বোচ্চ ১৪-১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হয়তো রেজাল্ট পাওয়া যাবে।
সরকার গঠনে গণভোটের প্রভাব থাকতে পারে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফল পাওয়ার পর সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এতে অবশ্যই গণভোট প্রভাব ফেলবে। যদি এবার ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়, সেক্ষেত্রে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নির্বাচিত সরকারের ঘাড়েই বর্তাবে। সেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষসহ বিভিন্ন ইস্যু সমাধান করেই সরকার গঠন হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলে সবকিছু শেষ করে হয়তো ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ আমরা নতুন সরকার দেখতে পাব।
এদিকে ভোট গণনায় বেশি সময় লাগলে গুজব ছড়ানোসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতা সৃষ্টির শঙ্কার কথা জানিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ফ ম জাকারিয়া।
তিনি বলেন, এবার কাউন্টিংয়ে দুই ধরনের বিষয় থাকায় আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে বেশি সময় লাগাটা স্বাভাবিক। প্রথমেই যদি আলাদা বক্স করা হয়, সেক্ষেত্রে অনুমানের চেয়ে কম সময় লাগতে পারে। প্রতিযোগী প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট কাছাকাছি থাকলে পোস্টাল ব্যালটের কাউন্টিংয়ের বিষয়গুলো বড় হয়ে সামনে আসবে এবং রিকাউন্টিংয়ের মতো বিষয়গুলো অনেক সংসদীয় এলাকায় দেখা দিলে বেশি সময় লাগতে পারে।
ভোট গণনায় বাড়তি সময় বিভিন্ন ধরনের গুজব সৃষ্টিতে টনিক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর পরিণাম স্বরূপ সরকার গঠন রাজপথে ও আইনি লড়াইয়ের মধ্যে পড়তে পারে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন অধ্যাপক জাকারিয়া।
তবে ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হলে সেক্ষেত্রে সরকার গঠনে সময় কিছুটা কম লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য সবকিছুই নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারি জনতার রায় কোন দিকে যায় তার ওপর।