News update
  • Cheap reading glasses remain key conduit to better quality of life     |     
  • ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর     |     
  • Putin offers to help end Iran war in meeting with Pezeshkian     |     
  • Fired OpenAI Researchers Say Dismissals Chilled Safety Efforts     |     
  • Dhaka Fifth Most Polluted City Globally on Friday Morning     |     

নেপালে এখনও ধ্বংসের ছাপ, কাদার নিচে চাপা মানুষের স্বপ্ন

গ্রীণওয়াচ ডেস্ক বিপর্যয় 2026-09-18, 10:10am

nepaal-c144cd82b3c6bf26a21ad25d3a77ea641789704615.jpg




সকাল থেকে সন্ধ্যা—পুরো দিন দেবীঘাটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও এখানকার মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আজ সারাদিন সরেজমিনে দেবীঘাটের বাজার, নদীর তীর, ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনও সর্বত্র দৃশ্যমান। কোথাও ঘরের ভেতর জমে থাকা পলি, কোথাও ভেঙে পড়া দেয়াল, কোথাও কাদার নিচে চাপা পড়ে থাকা দোকানের মালামাল। মানুষের মুখে এখনও আতঙ্ক, শোক আর অনিশ্চয়তার ছাপ।

দূর থেকে ত্রিশূলী নদীকে এখন শান্তই মনে হয়। স্বাভাবিক গতিতে বয়ে যাচ্ছে পানি। কিন্তু নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কয়েক সপ্তাহ আগের সেই ভয়াবহতার চিহ্ন। নদীর স্রোত যে কতটা ভয়ংকর ছিল, তার সাক্ষ্য দিচ্ছে ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ।

নেপালের নুয়াকোট জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই জনপদ কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল কর্মচঞ্চল। বাজারে ছিল মানুষের ভিড়, দোকানে ছিল বেচাকেনা, সড়কে চলত যানবাহন। কিন্তু ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢল মুহূর্তেই বদলে দেয় সেই পরিচিত দৃশ্য। ত্রিশূলী অববাহিকার প্রবল স্রোত আঘাত হানে নদীর দুই তীরের জনপদে। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাপকভাবে।

বন্যার সময় মানুষের সামনে ছিল শুধু প্রাণ বাঁচানোর চিন্তা। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। কেউ সন্তানকে নিয়ে ছুটেছেন উঁচু জায়গায়, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই মুহূর্তে ঘরের আসবাব, দোকানের মালামাল কিংবা জীবনের সঞ্চয় বাঁচানোর কথা ভাবার সুযোগই ছিল না।

পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব।

দেবীঘাট বাজারের একটি দোকানে দেখা গেল, এখনও পুরু পলির স্তর জমে আছে। দোকানের মালামালের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। কাদামাটি সরানোর কাজ চলছে, কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ দেখে আবার ব্যবসা শুরু করা নিয়েই অনিশ্চয়তায় দোকানিরা।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী সুরেন্দ্র বাহাদুর বলেন, বন্যায় দোকানের অনেক মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। দোকানের ভেতরে ও সামনে পলি জমে আছে। পানি চলে গেলেও সেই পলি সরাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। দোকান পরিষ্কার করলেও আবার নতুন করে মালামাল তুলতে হবে। এত বড় ক্ষতির পর কীভাবে ব্যবসা শুরু করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।

শুধু সুরেন্দ্র বাহাদুর নন, দেবীঘাটের অনেক ব্যবসায়ীর একই অবস্থা। কারও দোকানের পণ্য নষ্ট হয়েছে, কারও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট ব্যবসা ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে আবার আয় শুরু করবেন।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন এখানকার কিছু পরিবার।

শচীন তাদেরই একজন। ভয়াবহ বন্যায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর বাবা-মা ও ভাই-বোনকে। আজও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে যেমন ভেসে ওঠে হারানো ঘরবাড়ির স্মৃতি, তেমনি তাঁর কাছে প্রতিটি জায়গাই মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের কথা।

শোকে কাতর শচীন বলেন, আমি আমার বাবা-মা ও ভাই-বোন হারিয়েছি। ঘরবাড়ি বা সম্পদ হারানোর কষ্ট আছে, কিন্তু আপন মানুষ হারানোর কষ্ট সবচেয়ে বেশি। তাদের ছাড়া সবকিছুই শূন্য মনে হয়।

শচীনের এই কথার মধ্যেই যেন দেবীঘাটের সবচেয়ে বড় বেদনার প্রতিচ্ছবি। বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। নদী ও দুর্গম এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোথাও উদ্ধার হচ্ছে মরদেহ, আবার কোথাও পরিবারগুলো এখনও প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায়।

দেবীঘাটের ক্ষত শুধু বসতবাড়ি ও দোকানে সীমাবদ্ধ নয়। যোগাযোগব্যবস্থাতেও নেমে এসেছিল বড় বিপর্যয়। প্রবল স্রোতে সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আশপাশের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি পণ্য পরিবহন ও মানুষের চলাচলে দেখা দেয় দুর্ভোগ।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নেপালি সেনাবাহিনীর উদ্যোগে দ্রুত অস্থায়ী অ্যাক্রো ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। সেতু চালুর পর যোগাযোগব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, যোগাযোগের পথ খুললেও মানুষের জীবনযাত্রা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

সারাদিন দেবীঘাট ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পরিবার এখনও নিজেদের ঘর পরিষ্কার করার কাজে ব্যস্ত। কেউ কাদা সরাচ্ছেন, কেউ ভাঙা জিনিসপত্র আলাদা করছেন, কেউ আবার ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন করে কীভাবে জীবন শুরু করবেন তার হিসাব করছেন।

একদিকে ঘর হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা। তার ওপর কোনো কোনো পরিবারের জীবনে যুক্ত হয়েছে স্বজন হারানোর অপূরণীয় শোক।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা, যোগাযোগব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার এবং নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দেবীঘাটের চিত্র আরও বিষণ্ন হয়ে ওঠে। দিনের আলোয় যেখানে মানুষ ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে ব্যস্ত, সেখানে সন্ধ্যার পর নেমে আসে নীরবতা। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ ভবিষ্যতের চিন্তা করেন, কেউ হারানো স্বজনের কথা মনে করে কাঁদেন।

ত্রিশূলী নদী তখনও বয়ে চলে। শান্ত, স্বাভাবিক, নিজের গতিতে।

কিন্তু নদীর পাড়ে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ বলে দেয়—এই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ রাতের গল্প।

দেবীঘাটের কাদার নিচে তাই শুধু ঘরবাড়ি কিংবা দোকানের মালামাল চাপা পড়ে নেই। চাপা পড়ে আছে মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়, জীবিকা, স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্ন।

তারপরও মানুষ হাল ছাড়েনি। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কেউ আবার দোকান খুলতে চান, কেউ নতুন ঘর তুলতে চান। আর স্বজনহারা শচীনের মতো মানুষগুলো বুকের ভেতর অপূরণীয় শূন্যতা নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এনটিভি