News update
  • Bangladesh to Introduce New Law to Curb Extortion, IGP Says     |     
  • UN Marks 81 Years of Global Cooperation and Peace     |     
  • Dhaka's air 5th worst in the world this morning     |     
  • Around 7,500 Bangladeshis imprisoned in Saudi Arabia: Shama Obaed     |     
  • Bangladesh Outperforms India in Global Hunger Index 2026     |     

ঊনসত্তরের গণ–আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শহীদ আসাদ

যুগ যুগের আন্দোলন ও বিপ্লবের প্রেরণা (এক সহযোদ্ধার স্মৃতিকথা)

বিবিধ 2026-01-24, 12:56am

284374215_8275582349134403_2609089324711587382_n-bc77587c8879ebfbde79b9c2e322bfd51769194560.jpg

Prof. Jasim Uddin Ahmad



প্রফেসর জসিম উদ্দিন আহমেদ, 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ২০০৬ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত।

বছর দেড়েক আগেই আমরা ইতিহাসের আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছি—বাংলাদেশের ছাত্র–গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী শাসনের পতন। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যখন ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ এক কণ্ঠে রাস্তায় নামে, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থাও টলে ওঠে। এই সত্যটি প্রথম রক্ত দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের অন্যতম শহীদ আসাদ।

২০ জানুয়ারি—শহীদ আসাদ দিবস। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের ছাত্র–গণ আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে, ১৯৬৯ সালের এই দিনে, ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল আমাদের প্রিয় আসাদ ভাই আসাদুজ্জামানের বুকের তাজা রক্তে। তিনি ছিলেন দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রথম সারির এক আপোষহীন সংগঠক। আসাদ ভাই কেবল একজন শহীদ নন—তিনি আমাদের অহংকার, আমাদের চেতনার গভীরে প্রোথিত এক অমলিন প্রতিজ্ঞা।

আসাদই ছিলেন ঊনসত্তরের ছাত্র আন্দোলনের মশাল জ্বালানোর প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তাঁর শাহাদতের পরপরই ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় সর্বব্যাপী গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে, যার অনিবার্য পরিণতিতে পতন ঘটে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। ’৫২–এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’৬৯–এর গণঅভ্যুত্থান—এই ধারাবাহিক পথ ধরেই আমরা পৌঁছাই মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ হাজারো মানুষকে লড়াইয়ে নামার সাহস জুগিয়েছে।

কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শহীদ আসাদ ভাইয়ের রাজনৈতিক বিশ্বাস, তাঁর শেষ দিনগুলো এবং তাঁর সংগ্রামের চরিত্র নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। আসাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার গভীর সাংগঠনিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে আমি মনে করি—এই বিভ্রান্তি দূর করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। বয়সের ভারে আমি আজ ক্লান্ত হলেও স্মৃতি এখনো স্পষ্ট। ইতিহাস বিকৃত হলে ভবিষ্যৎ পথ হারায়—এই বিশ্বাস থেকেই আমি কলম ধরেছি।

শহীদ আসাদ ভাইকে নিয়ে লিখতে গেলে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব আমাকে ঘিরে ধরে। একদিকে গর্ব—কারণ আমি তাঁর সহযোদ্ধা ছিলাম। অন্যদিকে গভীর বেদনা—কারণ আমি আমার প্রিয় এক বিপ্লবী সাথীকে হারিয়েছি চিরতরে।

আমি ও আসাদ ভাই দুজনেই নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামের সন্তান। কৃষক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে শিবপুরের অবদান ইতিহাসস্বীকৃত। শিবপুর হাই স্কুলে পড়াকালেই আসাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে—যদিও তিনি আমার চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র। ’৬২–এর শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা একই কাতারে দাঁড়িয়ে সংগ্রামের সহযাত্রী হয়ে উঠি। চিন্তা ও চেতনায় আমরা দুজনেই ছিলাম স্পষ্টভাবে প্রগতিশীল।

স্কুল পেরিয়ে আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই, আর আসাদ ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সময় আমরা ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর নেতা আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসি। তাঁর নির্দেশেই শিবপুর অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক কাজ শুরু করি।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই আমরা মওলানা ভাসানীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হই। শিবপুরের সন্তান হওয়ায় ভাসানীর কর্মকাণ্ড খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। ১৯৬৯–এর প্রাক্কালে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ভাসানীর নির্দেশে শিবপুরে কৃষক সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে আসাদ ভাইসহ আমরা বহু সহযোদ্ধা চিন্তা ও বিশ্বাসে দৃঢ় থেকে একসঙ্গে কাজ করেছি।

আসাদ ভাইয়ের কৃষক রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পেছনে তিনটি শক্ত ভিত্তি ছিল—ভাসানীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ, কাজী জাফর আহমদের অনুপ্রেরণা এবং মান্নান ভাইয়ের সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব। গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের সংগঠিত করেছি। কৃষকের ধান, বাঁশ—এই সামান্য সম্পদ দিয়েই আমাদের আন্দোলনের রসদ জুগিয়েছে গ্রামের মানুষ।

১৯৬৮–এর ৯ ডিসেম্বর ভাসানী আইয়ুব–মোনেম শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র করার ডাক দেন। লাট ভবন ঘেরাও, সর্বাত্মক হরতাল—সবকিছুতেই আমরা সক্রিয় ছিলাম।

২৯ ডিসেম্বর ভাসানীর ডাকে হাট–বাজার হরতাল পালিত হয়। মনোহরদীর হাতিরদিয়া বাজারে পুলিশের গুলিতে তিনজন কৃষক শহীদ হন, আসাদ ভাই গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থাতেই তিনি ঢাকায় এসে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় খবর পৌঁছে দেন। এই ঘটনা সারা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

হুলিয়া মাথায় নিয়েও আসাদ ভাই আন্দোলনের যোগাযোগ বজায় রাখেন। শিবপুরে ভাসানীর জনসভায় ১৪৪ ধারা ভেঙে তিনি প্রকাশ্যে বক্তৃতা দেন—সেই দিন আমি দেখেছি, ভয় কাকে বলে আসাদ ভাই জানতেন না।

১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আমরা একসঙ্গে স্টেডিয়ামে ছিলাম। পরদিন তাঁর ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও ২০ জানুয়ারি সকালে তাঁকে দেখি মিছিলে—আমার কাঁধে হাত রেখে তিনি বলেছিলেন,

“তোমরা ১৪৪ ধারা ভাঙবে আর আমি চলে যাব—তা হয়?”

এই কথাই ছিল তাঁর শেষ অঙ্গীকার। মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—ঢাকা শহর নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

ডা. আশিক, নাজমা শিখাসহ মেডিকেলের ছাত্ররা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁর লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। রক্তমাখা শার্টটি নাজমা শিখা রোকেয়া হলে লুকিয়ে রাখেন এবং পরদিন হাজারো মানুষের মিছিলে তা আমাদের পতাকায় পরিণত হয়।

শামসুর রাহমান লিখলেন—

“আসাদের রক্তে ভেজা শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকা।”

আসাদ ভাইয়ের শাহাদতের চার দিনের মাথায় শহীদ হন মতিয়ার রহমান। সন্তোষে ভাসানী ঘোষণা করেন “আসাদ নগর”। অবশেষে আইয়ুব শাসনের পতন ঘটে।

পরবর্তীতে আমরা প্রকাশ করি সংকলন “প্রতিরোধ”—যেখানে প্রথম ছাপা হয় আসাদের শার্ট কবিতা। আমি লিখি “আসাদ ভাইয়ের মন্ত্র: জনগণতন্ত্র”।

শিবপুরে প্রতিষ্ঠা করি শহীদ আসাদ কলেজ। আমার পিতা রায়হান উদ্দিন আহমদ সবচেয়ে বেশি জমি দান করেন। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ আসাদ স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন—একটি বহু প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—

শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতি এত দ্রুত হতো না।

তাই আজও, আগামীকালও, যুগ যুগ ধরে—

আসাদের রক্তমাখা শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকা হয়ে

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।