
গুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মাস্টারমাইন্ডদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের জোর দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে শনিবার (২৯ আগস্ট) এ দাবি জানান তিনি।
বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আজকের এই দিনে আমরা গুমের শিকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাদের শোকার্ত ও প্রতীক্ষারত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। প্রিয়জন হারানোর নির্মম যন্ত্রণা কতটা দুঃসহ, তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও প্রিয় মানুষের সন্ধান না পেয়ে অগণিত পরিবার আজও গভীর মানসিক ট্রমা ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে; অনেক পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, আধুনিক সভ্যতার যুগেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্বৈরাচারী শাসকদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বহু মানুষ প্রতিনিয়ত গুম হচ্ছেন। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিরোধী মত ও কণ্ঠরোধ করার ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালা, যেখানে বছরের পর বছর ধরে নিরীহ মানুষের ওপর ইতিহাসের বর্বরতম নির্যাতন চালানো হয়েছে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে এভাবে নাগরিকদের গুম করে রাখা কেবল মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনেরও সুস্পষ্ট পরিপন্থি।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট উদাহরণ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ৮ বছরের অবর্ণনীয় বন্দিদশা ও গুম থাকার পর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান আহমদ বিন কাসেম ফিরে আসলেও, জামায়াত নেতা হাফেজ জাকির হোসাইন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিবিরের নেতা আল মোকাদ্দাস ও মোহাম্মদ ওলিউল্লাহ, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমসহ বহু নিখোঁজ ব্যক্তি আজও ফিরে আসেননি। তাদের ভাগ্য এখনও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঝুলছে।
তিনি আরও বলেন, গুম প্রতিরোধ ও গুমের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকার অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে অস্বীকৃতি জানায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অধ্যাদেশটির বিভিন্ন বিধানে অসঙ্গতি রয়েছে। তাই এগুলো অনুমোদন না করে সরকার বলেন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই বাছাইক্রমে ভবিষ্যতে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে।
‘সংসদের প্রথম অধিবেশন আহবানের ৩০ দিন পরে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫ এর কার্যকারিতা লোপ পায়। সরকার পরবর্তীতে উক্ত অধ্যাদেশটিতে কিছু পরিবর্তন এনে নতুন খসড়া বিল প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু উক্ত খসড়া বিলে আইনটি প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যকেই অকার্যকর করে দেওয়া হচ্ছে। নতুন খসড়া বিলে গুম সংক্রান্ত আইনের সংজ্ঞাসহ বিভিন্ন ধারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গুমের মতো গুরুতর অপরাধ, যা সাধারণত শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তার অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে প্রদান করা হয়েছে। তদন্তের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গুম একটি বিশেষ ধরনের অপরাধ যার মোকাবিলায় বিশেষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অপরাধের তদন্তভার পুনরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই তুলে দেওয়া একটি অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত।
তাছাড়া, গুম সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুমের ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীন সরকার নিজেই সম্পৃক্ত থাকে। তাই সরকারের অধীনে এই তথ্যভাণ্ডার কতটা নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষিত হবে এবং জনগণের সামনে গুমের সঠিক তথ্য প্রকাশ পাবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, নতুন বিলে গুম সংক্রান্ত তদন্ত ও অনুসন্ধানসহ সমস্ত কার্যক্রম থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ গুমের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ের সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের মতো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার হাতেই থাকা উচিত ছিল। এছাড়া সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’-এর জন্যেও একটি নতুন খসড়া বিল প্রণয়ন করেছে, যেখানে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। যার মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনকে কার্যত একটি নখদন্তহীন বাঘ-এ পরিণত করা হয়েছে।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান সরকার এই মানবিক সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। নিখোঁজ ও গুম হওয়া সকল নাগরিককে দ্রুত সময়ের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি, গুমের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল ব্যক্তি ও মাস্টারমাইন্ডদের বিচারে আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
আমরা আরও প্রত্যাশা করি যে, সরকার সকল প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসবে। জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা চিন্তা করবে। জনগণের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুমকে একটি বিশেষ অপরাধ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করবে। একইসঙ্গে এই বিশেষ ধরনের অপরাধের সঠিক অনুসন্ধান, সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের জন্য একটি বিশেষ ও স্বাধীন আইনি কাঠামো গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করবে।