
ইরানজুড়ে এখনো চলছে বিক্ষোভ। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত
দেশব্যাপী আবারও গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান সরকার। সেই বিক্ষোভ থেকে উঠেছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পদত্যাগের দাবিও। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করলেও, এড়ানো যায়নি প্রাণহানি। পাশাপাশি, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে তেহরানের। এমন প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকার সক্ষম হবে নাকি পতনই হবে শেষ পরিণতি, তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে চলছে তুমুল আলোচনা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইরানের সব রাজ্যেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে সরকারের পতনের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। আর প্রকাশ্যেই এ বিক্ষোভের প্রতি জোরালো সমর্থন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১ জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যা আরও বেশি।
টানা বিক্ষোভের মুখে সরকার ব্যাপক চাপের মুখে পড়লেও, ইরানে এখনই ইসলামি শাসনের অবসান ঘটছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সময় এখনো হয়নি বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
ইরানে বিক্ষোভ কেন?
অনেকের দাবি, ইরানে খামেনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বহু বছর ধরেই জমতে জমতে ‘বিস্ফোরণের দিকে’ এগোচ্ছিল।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে চলমান বিক্ষোভের সূচনা হয়। তবে এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে আরও গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ।
এর মধ্যে রয়েছে—
১. বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরাসহ ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার কড়াকড়ি, যা নারীসমাজ ক্রমশ প্রকাশ্যে অমান্য করছে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা।
৩. লেবানন, গাজা, ইরাক ও ইয়েমেনে প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে বিপুল ব্যয়।
৪. পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের কেন্দ্রীয়করণ নীতি, যার ফলে দেশটি ক্রমেই খরার ঝুঁকিতে পড়ছে।
চলমান আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত বাজারভিত্তিক ব্যবসায়ী ও দোকানিদের মাধ্যমে। তবে গত এক সপ্তাহে এতে যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের কর্মীরা। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সেই সময় কঠোর দমন-পীড়ন চালালেও, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন রূপে এই প্রতিবাদ অব্যাহত আছে।
ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি
কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, ইরান সরকার এখন নতুন করে বহিরাগত বা বিদেশি চাপের মুখেও পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যা না করতে’ তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত’।
এছাড়া ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি আবার পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত না করে, তবে নতুন করে সামরিক হামলা চালানো হবে।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ‘ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। গত বছরের জুনে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রও সেই যুদ্ধে যুক্ত হয়। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার দাবিও করেন ট্রাম্প।
তবে বহু বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএ এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল অবকাঠামো টিকে আছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প আবারও অভিযোগ করেছেন, ইরান নতুন পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির চেষ্টা করছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করছে। তিনি এ ধরনের তৎপরতা ‘নির্মূল’ করার হুমকিও দেন।
আত্মরক্ষায় প্রস্তুত ইরান
জনপ্রিয়তা কমলেও ইরানের সরকার এখনও শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত আধাসামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বিপ্লবী কমিটি ও ধর্মীয় নেটওয়ার্ক। এসব বাহিনীর ভাগ্য সরকারের টিকে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই বাহিনীগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই ১৯৭৮–৭৯ সালের বিপ্লবের পর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পশ্চিমাপন্থি রাজতন্ত্র উৎখাতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা জানেন, সরকার পতন হলে তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বিদেশি হুমকির মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও নিয়েছে তেহরান। যুদ্ধ কৌশলে বিনিয়োগের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে দেশটি। ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের পর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং রাশিয়া ও চীন থেকে নতুন অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহে তেহরান মনোযোগ দিয়েছে বলেও জানা যায়।
তবুও বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য অত্যন্ত সংকটময় বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে ভেনেজুয়েলার সরকার পতনের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইরানের ভেতরে ও বাইরে বহু মানুষ ধর্মীয় শাসনের অবসান চান এবং নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভিকে দেশে ফিরিয়ে এনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দাবি তুলছেন। তবে ট্রাম্প ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে নন বলে জানা যাচ্ছে।
তার আশঙ্কা, এই পরিবর্তন ১৯৭৯ সালের মতো রক্তক্ষয়ী ও বিশৃঙ্খল হতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, তার অগ্রাধিকার পশ্চিম গোলার্ধ।
৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার ইরান একটি বৈচিত্র্যময় ও জটিল রাষ্ট্র। তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরের দীর্ঘতম উপকূলরেখা দেশটির দখলে, যা বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ইরান প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এসব বিষয় ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনায় থাকারই কথা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।সূত্র: দ্য কনভারসেশন