
মুখের গাল, থুতনি কিংবা ঘাড়ে বাড়তি মেদ অনেকের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই শুধু মুখের মেদ কমানোর জন্য নানা ধরনের ফিতা, যন্ত্র বা বিশেষ ব্যায়ামের ওপর ভরসা করেন। তবে শরীরের নির্দিষ্ট একটি অংশের মেদ আলাদাভাবে কমানো সহজ নয়। বরং পুরো শরীরের বাড়তি মেদ কমানোর দিকেই নজর দেওয়া বেশি কার্যকর।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ধীরে ধীরে শরীরের মেদ কমতে পারে। এর প্রভাব মুখের গাল ও থুতনিতেও পড়তে পারে। মুখ কিছুটা স্লিম দেখাতেও সহায়তা করতে পারে কয়েকটি সহজ অভ্যাস।
শুধু মুখের মেদ কি আলাদাভাবে কমানো যায়?
শরীরের নির্দিষ্ট একটি জায়গার মেদ কমানোর ধারণাকে লক্ষ্যভিত্তিক মেদ কমানো বলা হয়। তবে শুধু মুখের মেদ কমানোর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ খুব সীমিত।
শরীরে মেদ বিভিন্ন জায়গায় জমা থাকে। শরীরচর্চার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী এসব মেদ শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই শুধু মুখের ব্যায়াম করলেই ওই জায়গার মেদ কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পুরো শরীরের মেদ কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়াই তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি।
১. মুখের কিছু ব্যায়াম করতে পারেন
মুখের বিভিন্ন ব্যায়াম মুখের পেশি শক্তিশালী করতে এবং মুখের গঠন কিছুটা টানটান রাখতে সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মুখের ব্যায়াম গালের পেশির গঠন ও মুখের সামগ্রিক সৌন্দর্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এসব ব্যায়াম সরাসরি মুখের মেদ কমায়—এমন শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
সহজ কিছু ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে—গাল ফুলিয়ে বাতাস এক পাশ থেকে অন্য পাশে নেওয়া, দুই পাশের ঠোঁট পালা করে সংকুচিত করা এবং কয়েক সেকেন্ড দাঁত চেপে হাসির ভঙ্গি ধরে রাখা।
২. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
হৃদ্স্পন্দন বাড়ায় এমন শরীরচর্চা শরীরের মেদ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন—দৌড়ানো, সাইকেল চালানো কিংবা দ্রুত হাঁটা।
এক গবেষণায় ১২ সপ্তাহের নিয়মিত বায়বীয় শরীরচর্চার পর শরীরের ওজন, মেদের পরিমাণ ও কোমরের মাপ কমার পাশাপাশি পেশির পরিমাণ বাড়তে দেখা গেছে।
নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে ভার তোলার ব্যায়াম ও সুষম খাবার যুক্ত করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে আরও ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীর সুস্থ রাখতে পানির গুরুত্ব অনেক। ওজন নিয়ন্ত্রণেও পর্যাপ্ত পানি পান সহায়ক হতে পারে।
খাবারের আগে পানি পান করা, সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি খাওয়া এবং চিনিযুক্ত বা অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করার অভ্যাস ওজন কমানোর প্রচেষ্টায় কাজে আসতে পারে।
একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব অভ্যাস ১২ সপ্তাহে গড়ে ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু বেশি পানি খেলেই মেদ কমবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।
৪. মদ্যপান কমান
অতিরিক্ত মদ্যপান শরীরের ওজন ও মেদ বাড়াতে পারে। মদ্যপ পানীয়তে অনেক ক্যালরি থাকলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি তুলনামূলকভাবে কম।
এ ছাড়া মদ্যপান শরীর থেকে বেশি পানি বের করে দিতে পারে। এর ফলে শরীরে পানিশূন্যতা এবং অতিরিক্ত পানি জমে শরীর ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। মুখও কিছুটা ফোলা দেখাতে পারে।
৫. পরিশোধিত শর্করা কম খান
বিস্কুট, কেক, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত শস্যজাত খাবারে থাকা পরিশোধিত শর্করা ওজন বাড়াতে এবং শরীরে মেদ জমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এসব খাবার তৈরির সময় অনেক পুষ্টি উপাদান কমে যায় এবং চিনি ও ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
তাই পরিশোধিত শর্করার বদলে পূর্ণ শস্যজাত খাবার বেছে নেওয়া ভালো। এতে সামগ্রিকভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মিলতে পারে, যার প্রভাব মুখের মেদ কমাতেও পড়তে পারে।
৬. প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমান
শুধু খাবার ও শরীরচর্চা নয়, ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও পেট ভরা থাকার অনুভূতির সঙ্গে জড়িত হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
ফলে বেশি খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে, অপ্রয়োজনীয় নাশতা খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং শরীরে মেদ জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ভালো মানের ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়।
৭. খাবারে লবণ কমান
অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে পানি জমে যেতে পারে। এর ফলে হাত-পা ছাড়াও মুখে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
শরীরে অতিরিক্ত লবণ যাওয়ার বড় একটি উৎস হলো প্রক্রিয়াজাত খাবার। তাই অতিরিক্ত নোনতা খাবার, প্যাকেটজাত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিবর্তে তাজা ও স্বাভাবিক খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
লবণ কম খেলে শরীরে পানি জমে তৈরি হওয়া মুখের ফোলাভাবও কিছুটা কমতে পারে।
৮. খাবারে আঁশ বাড়ান
ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবারের আঁশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আঁশযুক্ত খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয় এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এতে অপ্রয়োজনীয় খাওয়ার প্রবণতা ও খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা কমতে পারে।
একাধিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দ্রবণীয় আঁশ বেশি খেলে ক্যালরি কমানোর আলাদা চেষ্টা না করেও ওজন ও কোমরের মাপ কমতে পারে।
ফল, শাকসবজি, বাদাম, বীজ, পূর্ণ শস্য ও ডালজাতীয় খাবারে প্রচুর আঁশ থাকে। তাই প্রতিদিনের খাবারে এসব খাবার রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
মুখের মেদ কমাতে মূল কথা কী?
মুখের মেদ কমানোর জন্য শুধু মুখের দিকে নজর না দিয়ে পুরো শরীরের বাড়তি মেদ কমানোর চেষ্টা করাই বেশি কার্যকর। নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান, কম লবণ ও কম পরিশোধিত শর্করা খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং আঁশযুক্ত খাবার—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মুখে অতিরিক্ত ফোলাভাব বা মেদ নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে তিনি এর কারণ বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।