
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ খোঁজা হচ্ছে। যদি ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পাওয়া যায়, তাহলে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডকে গ্রামীণফোন ও রবির মতো শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে শনিবার (১৬ মে) টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ফকির মাহবুব আনাম আরও বলেন, টেলিটক থাকায় বেসরকারি অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে না। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পেলে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব। নতুন সরকার টেলিকম ও আইসিটি খাতকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে, যাতে তরুণদের দক্ষ করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়।
এছাড়া সরকার লাস্ট-মাইল ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পাহাড়ি ও চরাঞ্চলে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট, বিভাগীয় শহর ও শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫জি সম্প্রসারণ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো শেয়ারিং ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, টেলিকম ও আইসিটি খাতকে সরকার ‘থ্রাস্ট সেক্টর’হিসেবে দেখছে। এই খাত এখন সরকারের আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী টেলিকম ও আইসিটির জিডিপিতে অবদান ১ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। তবে সঠিক নীতি, অবকাঠামো ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এটি দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব এবং ১৫ শতাংশ অবদান অর্জনও বাস্তবসম্মত।
রেহান আসিফ আসাদ আরও বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে মোবাইলফোন ও ফিক্সড লাইনের গ্রাহকসংখ্যায় বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের একটি হলেও সেবার মান সূচকে অবস্থান ৯০-এর পরে। আগামী পাঁচ বছরে এই অবস্থান শীর্ষ ২০-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, মোবাইলফোন অপারেটরদের কার্যকর করহার ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ২২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় কর কমানো চ্যালেঞ্জিং হলেও আসন্ন বাজেটে গ্রাহক স্বার্থ বিবেচনায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
রেহান আসিফ আসাদ আরও বলেন, দেশে এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৫০ শতাংশ, যা ৪জি-৫জি বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় বাধা। এই কারণে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সহজ কিস্তিতে (ইএমআই) ফোন কেনার জন্য মোবাইলফোন অপারেটর ও ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় কোনো মনোপলি থাকবে না। তিনি আরও জানান, তরঙ্গের দাম কমলে রাজস্ব বাড়বে-এমন বিষয়গুলো নিয়ে বিটিআরসি বিশ্লেষণ করছে। পাশাপাশি একটি জাতীয় কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম বলেন, গত এক দশকে মোবাইলফোন গ্রাহক, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডাটা ব্যবহারে বড় অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এখনো মূলত ডিজিটাল কনজাম্পশন বাজারে সীমাবদ্ধ। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫–২৬ সময়ে মোবাইলফোন গ্রাহক সংখ্যা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩৭ শতাংশ বেড়ে মোট জনসংখ্যার ৭৩.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৮৬ জিবিপিএস থেকে ১২৭ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯৫৪ জিবিপিএসে পৌঁছেছে এবং গ্রাহকপ্রতি মোবাইল ডাটা ব্যবহার ১০০ এমবি থেকে ৮ গুণের বেশি বেড়ে ৮ জিবিতে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিযোগিতা আইন বিশেষজ্ঞ খালেদ আবু নাসের বলেন, বাজারের প্রায় ৯১ শতাংশ মুনাফা একটি কোম্পানির কাছে চলে যাচ্ছে, যা মনোপলি তৈরি করছে। বিটিআরসিকে কেবল রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে কাজ না করে কম্পিটিশন কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে।
এমটব মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার জাতীয় গ্রিড থেকে ডাটা সেন্টারগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকে সহায়তা করার অনুরোধ জানান।
একটি সুনির্দিষ্ট টেলিকম রোডম্যাপ তৈরি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং বিটিআরসির ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনসহ কর সংস্কারের দাবি জানান ফিকি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিআইএম নুরুল কবীর।
বুয়েটের অধ্যাপক ও টেলিকম বিশেষজ্ঞ ড. লুৎফা আক্তার বিটিআরসির সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সেবার মান উন্নয়নের তাগিদ দেন।
বাংলালিংকের তাইমুর রহমান তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের উন্নয়ন এবং অবকাঠামো ভাগাভাগির মতো উদীয়মান সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন।
টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি বকেয়া ও তরঙ্গ বরাদ্দ সংক্রান্ত কিছু রিপোর্টের ব্যাখ্যা দেন এবং টেলিটকের উন্নয়নে নতুন সরকারি বিনিয়োগের অনুরোধ জানান।
টিআরএনবি সভাপতি সমীর কুমার দে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবি সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন।