News update
  • Myanmar: UN chief for urgent access as quake toll mounts     |     
  • AI’s $4.8 tn future: UN warns of widening digital divide      |     
  • Volker Turk warns of increasing risk of atrocity crimes in Gaza     |     
  • Ultimate goal is to join ASEAN as full member, says Dr Yunus      |     
  • South Korea President Yoon Suk Yeol removed from office      |     

খোকা ভাই কথা রেখেছিলেন

সেলিব্রিটি 2023-11-02, 1:54am

atiqur-rahman-salu-328407c6a6d0690778e26c31178f2d821698868463.jpeg

Atiqur Rahman Salu



আতিকুর রহমান সালু

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। আজ আর নেই। ৪ নভেম্বর, ২০১৯ সনে দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যানসারের সাথে যুদ্ধ করে নিউইয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যিনি বিজয়ী বীর তিনি হেরে গেলেন জীবনযুদ্ধে মৃত্যুর কাছে। কিন্তু রেখে গেছেন অমর কীর্ত্তী। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। মধ্যষাট দশকে আমি তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র  ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। তখন সংগঠনের সভাপতি ছিলেন মো ̄Íফা জামাল হায়দার ভাই ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহাবুব উল্লাহ ভাই। সেই সময়ে তৎকালীন সারা পূর্ব পাকিস্তান অধুনা স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বত্রই সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল। বিশেষ করে ঢাকার সর্বত্র সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাড়া মহল্লায় সংগঠনের শাখা গঠন উপলক্ষ্যে চারণের বেশে ঘুরে বেড়িয়েছি।

Sadek Hossain Khoka

খোকা ভাই যেখানে থাকতেন সেই গোপীবাগে ছাত্র ইউনিয়নের এক সভায় তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় সন ১৯৬৭। সেই শুরু তারপর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে আমার সখ্যতা গভীরভাবে অটুট ছিল। স্মৃতিপটে জমে আছে কত কথা, কত ছবি। তার সাথে আমার সম্পর্কের সেইসব ঘটনাবহুল কথাগুলো লিখে শেষ করা যাবে না। খোকা ভাই আমার কোন আত্মীয় ছিলেন না, কিন্তু তার চেয়ে বেশী ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। আমাকে যে তিনি কি ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন ও মান্য করতেন তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি ১৯৬২ সন থেকে ১৯৮২ সন পর্যন্ত একটানা কুড়ি বছর সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। মাঝখানে এই প্রবাস জীবন দলমুক্ত বটে তবে রাজনীতি মুক্ত নই। দেশের প্রতি আমার নাড়ীর টান এখনো অনুভব করি। দেশের প্রায় সবার সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ও আছে। খোকা ভাই অসুস্থ হয়ে নিউইয়র্কে যেদিন এলেন সম্ভবত তার পরের দিন আমাকে ফোন দিলেন, বললেন পারলে যেন দেখা করি এবং পরিস্কার মনে আছে এও বললেন আমার চিকিৎসা চলবে কিছু পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে হবে।

আমি অবশ্যই আপনার সাথে দেখা করতে আসবো......। এরপর অনেকবার তার সাথে কথা হয়েছে। দেখাও হয়েছে। আমি মনে করিয়ে দিতাম যে কি খোকা ভাই আর তো আসলেন না। আমাদের নিউজার্সীর বাসায়? খোকা ভাই বলেন, দেখেন না, এই হাসপাতালের দৌড়াদৌড়ির মধ্যে আছি, কত যে পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং আবার তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষনে থাকতে হচ্ছে। তবে কথা যখন দিয়েছি অবশ ̈ই যাবো আপনার ওখানে। একবার আমি আমার সহধর্মিনীকে নিয়ে তাকে দেখতে গেলাম। দেখলাম শারীর তেমন ভালো নেই। আমাদের সাথে অনেক কথা বললেন। আমার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞাস করলো আপনি কি খেতে ভালোবাসেন। খোকা ভাই বললেন, সবই খাই তবে ‘রিচ ফুড’ না, এই মাছ ও শাক সবজি আমার পছন্দ। ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। মাঝে মাঝেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। নিউইয়র্কে আসা অবধি হাসপাতাল থেকে বাসা, আবার হাসপাতাল বাসা করে করেই তার সময় কাটতো। আমাকে তিনি জানালেন যে, ঢাকার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও বৈধ কাগজপত্র নিয়েই তিনি চিকিৎসার জন ̈ আমেরিকায় এসেছেন। খোকা ভাই ছিলেন দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসার চিকিৎসার কারণে হাসপাতলের ডাক্তারদের নিবীড় পর্যবেক্ষনে। কিন্তু খুবই দু:খজনক যে, ক্যানসারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সরকার তার অনুপস্থিতিতে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে। সরকার কার বুদ্ধিতে এই অমানবিক আচরণ করতে পারলো এটা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। খোকা ভাই ক্যানসারের কষ্ট যন্ত্রনা নিয়ে ধুকে ধুকে মৃতু ̈বরণ করে প্রমাণ করলেন যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অসুখের ভান করে আমেরিকায় থেকে যান নি।

একজন সাহসী মু৩িযোদ্ধা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে যে বাংলাদেশ আমাদের উপহার দিয়ে গেলেন। সেই স্বাধীন দেশে তিনি লাশ হয়ে ফিরলেন। তবে তার মৃতদেহ দেশে পৌছালে লক্ষ লক্ষ জনতা যেভাবে তাকে বরণ করে নিলো, যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত করলো তা অভূতপূর্ব। এই লক্ষ লক্ষ জনতার ভালোবাসা ও দোয়ার বরকতে পরম করুনাময় আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এই দোয়াই করি।  ̄স্মৃতিতে কত কথা, কত ঘটনা তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। খোকা ভাই বরাবরই ছিলেন রাজনীতি সচেতন ও সমাজ সচেতন ব্যক্তি। স্বাধীনতার আকাংখায় আমরা যখন উজ্জিবীত তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এর নাম পরিবর্তন করে সংগঠনের নাম রাখা হয় পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন। আমি তখন উক্ত সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও জুনো ভাই ছিলেন সভাপতি। সেই কমিটিতে খোকা ভাই সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সনে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের বিশাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে সারা বাংলাদেশ থেকে ২০ হাজার ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিল। সেই সম্মেলন উদ্বোধন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার  ̄স্বপ্নদধষ্টা মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সেই সম্মেলনে আমি সভাপতি ও মান্নান খান সম্পাদক নির্বাচিত হই।

খোকা ভাই আমাদের সেই কমিটির ক্রিড়া সম্পাদক ছিলেন। ক্রমান্বয়ে গোপীবাগ এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার, মেয়র, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটির মেয়র। তিনি বহুবিধ উন্নয়নমূলক কাজ করে গেছেন। দেশ বরেণ্য  ব্যক্তিদের নামে সড়কের নামকরণ করেছেন। এর মধে ̈ রাষ্ট ভাষা মতিনের নাম উল্লেখ্য।

খোকা ভাই ছিলেন বরাবরই মানব দরদী। তখন আমি একদিন তার বধাদার্স ক্লাবে বসে আছি, হঠাৎ করে একজন খবর নিয়ে আসলো কোথাও কেউ একজন মারা গেছে। তার লাশ সৎকারের প্রয়োজন। খোকা ভাই তড়িৎ ছুটে গেলেন সেখানে। নীরবে করেছেন অনেক দান খয়রাত। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ভালোবাসাই ছিলো তার উদ্দেশ্য। মানুষের কল্যাণে তার কাজ করাই ছিলো ব্রত। তিনি ছিলেন নিরহংকারী ও বিনয়ী ও ভদঃর। আমার প্রতি ছিল তার অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। একটা ঘটনার কথা আমাকে নিঃসংকোচে বলতেই হচ্ছে।

১৯৮২ সালে আমি আমেরিকা আসি। আমার আসার দু’একদিন পূর্বে হঠাৎ দেখি খোকা ভাই আমি যেখানে থাকতাম সেখানে এসে হাজির। আমি বললাম খোকা ভাই কি খবর? উত্তরে বললেন, আপনি শুনেছি আমেরিকা যাচ্ছেন, তাই দেখা করতে এলাম এই বলে আমার হাতে একটি খাম দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা কি খোকা ভাই? কোন চিঠি আমেরিকায় কাউকে দিতে হবে? খোকা ভাই যা বললো আমি তাতে আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললেন, আমার নেতার জন্য সম্মানী। নেতা বিদেশ যাচ্ছে, আমি কিছুই করবো না। আমি বললাম, খোকা ভাই কিছু লাগবে না। খোকা ভাই কিছুতেই শুনলেন না। খামটা আমি রেখে দিলাম। পরে খুলে দেখি কয়েকশ টাকা। চোখের সামনে সেই দৃশ্য এখনো ভেসে উঠে।

আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতেই হচ্ছে। ২০১৪ সনের কথা। নিউইয়র্কের লাগোরডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলে ফোবানা সম্মেলন। খোকা ভাই প্রধান অতিথি। খোকা ভাই মঞ্চে উপবিষ্ট। ফোবানার সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ আমি যুক্ত। ফোবানার চেয়ারম্যানও ছিলাম। যাই হোক মঞ্চে খোকা ভাইকে দেখে হাত মিলাতে গেলাম। খোকা ভাই তখন, লাঠি ভর করে হাঁটেন। আমাকে দেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন বললেন বসেন, আমি বললাম খোকা ভাই উঠবেন না আপনি বসেন। খোকা ভাই বললেন, আমার নেতা দাঁড়িয়ে থাকবে আর আমি বসে থাকবো! সম্ভবত মাইক্রোফোনটা অন ছিল। হল ভর্তি দর্শক শ্রো তা সবাই সেই কথা শুনতে পেল। নেতার প্রতি সহযোদ্ধার এই শ্রদ্ধা ভালোবাসার কি কোন তুলনা হয়?

রাজনীতিতে পারষ্পারিক এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই। খোকা ভাইয়ের শরীরটা তখন ভালো যাচ্ছিলনা। বাসা আর হাসপাতাল করে সময় কাটছে।

আমার সহধর্মীনিকে বললাম খোকা ভাইকে দেখতে যেতে হবে। এর মাঝেই হঠাৎ খোকা ভাই এর ফোন। সালু ভাই, বাসায় আছেন? আমি বললাম হ্যাঁ, কেন? উত্তরে বললেন- কাল আমি আসছি আপনার বাসায়। আমি শুনে বললাম- শরীর ভালো হলে আসুন। বললেন না আমি আসছি। আমি আমার স্নেহভাজন মোহাম্মদ হোসেন খানকে অনুরোধ করলাম খোকা ভাইকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতে। যথারীতি মোহাম্মদ হোসেন খান তদ্বীয় পত্নী অপিকে ও খোকা ভাই এবং ইসমত ভাবীকে নিয়ে আমাদের বাসায় নিয়ে উপস্থিত। খোকা ভাই খুবই অসু ̄স্থ, তাকে ধরে বাসায় আনলাম। কেন আসলেন? উত্তরে বললেন- নেতা আপনাকে কথা দিছি না? অবশ ̈ই আসবো দেখা করতে। আমার মুখে কোন কথা এলো না। অনেকক্ষণ মন খুলে গল্প করলাম আমরা রাত ১১টা পর্যন্ত।

দু’দিন পর ফোন পেলাম স্নেহাষ্পদ ছোট ভাই, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে, জানলাম খোকা ভাই এর অবস্থা খারাপের দিকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। পারলে আমি যেন তাকে দেখে আসি। সাথে সাথেই ঐদিন বিকেলেই আমি তাকে হাসপাতালে দেখতে গেলাম। তখনও জ্ঞান আছে। আমাকে দেখে চোখ নামিয়ে যেন, হ্যালো বললেন এবং চোখ বুঝলেন। আমি আমার হাতের মধ ̈ তার হাত টেনে নিলাম। খোকা ভাই আবার চোখ খুললেন, আমি আমার হাতের মধ্যে তার হাতের চাপ অনুভব করলাম। চোখের পলকে আমার পেছনের সব স্মৃতি যেন ভেসে এলো। চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। সজল চোখে বাসায় ফিরে এলাম। এর তিন দিন পরই খবর পেলাম খোকা ভাই আর নেই। জামাইকা মুসলিম সেন্টারে জানাজার নামাজে সামিল হলাম। শত শত লোকের উপস্থিতিতে জানাজার নামাজ সম্পন্ন হলো। কফিনে তখন তাঁকে এক নজর দেখার জনে ̈ মানুষের এত ভীড় প্রমাণ করলো খোকা ভাই কতটা প্রিয় ছিলেন। ঢাকায় তার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। তাকে প্লেনে তোলা হয়েছে। লাউঞ্জে ভাবী বসে। সাংবাদিক মনির হায়দার আমাকে জানালো ভাবী এখন ফ্রি আছেন, ফোন করতে পারেন। আমি ইসমত ভাবীকে ফোন দিলাম, সালাম দিলাম। ভাবী বললেন, দোয়া করবেন ভালোভাবে যেন দেশে যেতে পারি। তারপর যেটা বললেন এর জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ইসমত ভাবী বললেন একটা কথা বলি সালু ভাই, সেই অসু ̄’ শরীর নিয়ে আপনার বাসায় গেল, কেন জানেন? আমি জিজ্ঞাস করলাম কেন? ভাবী বললেন শুধু আপনাকে কথা দিয়েছিল যে আপনার বাসায় যাবে, দেখা করতে। শুনে আমি অভিভূত। ভাল করে কথা বলতে পারছিলাম না। আমি বাকরুদ্ধ। খোকা ভাইকে নিয়ে ইসমত ভাবী দেশে যাচ্ছেন। কিন্তু এই যাত্রা বড়ই কষ্টের। ভাবী খোকা ভাইয়ের নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে যাচ্ছেন একাকি। আমার ষোল বছরের মেয়ে আনিকাকে হারিয়ে ভাবীর কষ্ট যেন আমি অনুভব করতে পারছি। পরম করুনাময় আল্লাহতায়ালা তার পরিবার-পরিজনকে এই শোক সহ ̈ করার শক্তি দিন।

শুধু বললাম ভাবী দোয়া করছি ভালভাবে দেশে পৌঁছাবেন..........। ঢাকা এয়ারপোর্টে খোকা ভাইয়ের সেই প্রিয় ঢাকা শহরে সেই দিন লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতি জানিয়ে দিল একটিই বারতা। খোকা ভাইকে কেউ ভুলেনি, তিনি জীবিত আছেন আমাদের হৃদয় মাঝে। পরম করুনাময় আল্লাহতায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।